Home ইসলাম সফর ও এর নিয়মাবলী

সফর ও এর নিয়মাবলী

by admin
০ comment

সফর ও এর নিয়মাবলী

মোহাম্মদ আবুল হোসাইন চৌধুরী

সফর

ভ্রমনের উদ্দেশ্যে দূরবর্তী কোন স্থানে গমনের জন্য নিজ বাসভবন বা আবাসস্থল থেকে যাত্রা শুরু করাকে সফর বলে। রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের দূরত্বের কোনো সীমা রেখা নির্ধারণ করে দেননি। সাহাবিগণও কোনো সীমা রেখার কথা বলেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ সাধারণভাবে সফর শব্দ ব্যবহার করেছেন। কেউ কেউ মক্কা ও জিদ্দার ব্যবধান এবং মক্কা ও তায়েফের ব্যবধানকে সফরে ন্যূনতম স্ট্যান্ডার্ড ধরেছেন। নিজ এলাকা থেকে বের হওয়ার পর থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত সময়টি সফর বলে গণ্য হবে।
নিজের দেশে নিজের ঘর কখনো অন্য দেশ বা অন্যের ঘরের সমান হয় না। নিজের বাসস্থানে মানুষ যে আরাম-আয়েশে থাকে সফরে গেলে তা আর থাকে না এবং মানুষ এক ধরণের অস্থিরতার মধ্যে থাকে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, এই আধুনিক যুগেও সফরের সমস্যাবলী আগের মতোই বিদ্যমান। এ ছাড়া, এখনো বহু শহর ও গ্রাম আছে যেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা খুবই কম এবং সেখানে সফরে গেলে মানুষকে অনেক কষ্টে সময় কাটাতে হয়। তাই কসরের নামাজ এখনো অনেকের জন্য বড় ধরণের ছাড় বলেই গণ্য হয়। কাজেই কসরের নামাজ ও রোজা ভাঙার মতো ইসলামের নির্দেশাবলী সার্বিকভাবে মেনে চলতে বলা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্বে সফরে গেলে কসরের নামায পড়তেই হবে এবং রোজা রাখা যাবে না। মহান আল্লাহ ইসলামের আহকাম বা ধর্মীয় বিধিবিধান ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনের প্রয়োজনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করেছেন। সফরের সময় মানুষের পরিশ্রম ও কষ্টের কথা বিবেচনা করে নামাজ কসর পড়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সফরের ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপনে বিঘ্ন ঘটে এবং এ বিপত্তির বিষয়টি মানুষ মেনে নিয়েছে। অর্থাৎ মানুষ জানে, সফরে গেলে তার প্রতিদিনের খাওয়া-দাওয়া ও ঘুম ইত্যাদির রুটিনে বিঘœ ঘটবে। অবশ্য এখন সফরের কষ্ট অনেকটা লাঘব হয়েছে। তারপরও ঘরের পরিবেশ আর সফরের পরিবেশ এক হয় না।
হযরত য়ালা ইবনে উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে আরজ করলাম, আল্লাহপাকতো বলেছেন, যদি তোমরা কাফেরদের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য কোন রকম ফেতনার আশংকা কর তাহলে নামায কসর করাতে কোন দোষ নেই। এখনতো নিরাপত্তার যুগ (সুতরাং কসর না করা দরকার)। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি যে কথায় আশ্চার্যান্বিত হয়েছো আমিও সে ব্যাপারে আশ্চর্য বোধ করেছিলাম এবং রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম উত্তরে তিনি বললেন, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য একটি ছদকা। তোমরা আল্লাহর ছদকা গ্রহণ কর। (সহীহ মুসলিম)

সফর কত প্রকার কি কি?

সফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ফরয) দুই রাকা’আত পড়তেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রিসালাতকালে মোটামুটি চার প্রকার সফর করেছেন। সেগুলো হলো-
১.হিজরতের সফর।
২.আল্লাহর পথে জিহাদের সফর।
৩.ওমরার সফর।
৪.হজ্জের সফর।
রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য সবচেয়ে বেশি সফর করেছেন।

সফর কখন শুরু হয়

ভ্রমনের উদ্দেশ্যে আবাসস্থল থেকে যখন যাত্রা শুরু করা হয় তখন সফর শুরু হয়।
নাময কসর ও একত্র করার জন্যে সফরের দূরত্ব
রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের দূরত্বের কোনো সীমা রেখা নির্ধারণ করে দেননি। সাহাবিগণও কোনো সীমা রেখার কথা বলেননি। কতোটা দূরের সফর হলে নামায কসর করা যাবে, একত্র করা যাবে, (ফরয) রোজা স্থগিত করা যাবে-এসবের কিছুই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখ করেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ সাধারণভাবে সফর শব্দ ব্যবহার করেছেন । কেউ কেউ মক্কা ও জিদ্দার ব্যবধান ও মক্কা ও তায়েফের ব্যবধানকে সফরে ন্যূনতম স্ট্যান্ডার্ড ধরেছেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীগণ এমন কিছু নির্ধারণ করে দেননি। তাঁরা সফর কথাটি বলেছেন। সুতরাং যে দূরত্বকে সাধারণভাবে সফর বলা হয়, সেটাই সফর। মাইল নির্ধারণ করা আমাদের দায়িত্ব নয়। ‘সফর’ ছোট ও বড় হোক সফরই। ছোট বড় সব সফরেই কসর, দুই ওয়াক্ত নামায একত্র, রোযা স্থগিত করণ, তাইয়াম্মুম ইত্যাদি বৈধ।
মাসয়ালা :- কেউ যদি নিজ এলাকা থেকে আটচল্লিশ মাইল দূরে যাওয়ার এবং সেখানে পৌঁছে পনেরো দিনের কম থাকার নিয়ত করে তাহলে সে কসর পড়বে। নিজ এলাকা থেকে বের হওয়ার পর থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত সফরের মধ্যে গণ্য।

সফরের মেয়াদ/সময়

সফরের মেয়াদ হবে কমপক্ষে ৩ (তিন) দিন সবোর্চ ১৫ দিন।
১.হযরত ইমরান ইবনে হুছাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক সফরে ঘরে ফিরে আসা পর্যন্ত নামাযকে কসর করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঠার দিন মক্কা শরীফে ছিলেন। সেখানে মাগরিব ব্যতিত সব নামায দুই-দুই রাকা’আত পড়াতেন। সালাম ফিরার পর বলতেন, হে মক্কাবাসী! তোমরা নিজ নিজ নামায পুরা কর,আমরা মুসাফির। (মুসনাদে আহমদ)
২.হযরত নাফে (রঃ) থেকে বর্নিত, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কা শরীফে দশ রাত অবস্থান করেছিলেন তখন নামায কসর করতেন। কিন্তু যখন ঈমামের পিছনে পড়তেন তখন পূর্ণ পড়তেন।(মুয়াত্তা মালেক)।
মাসয়ালা:- কেউ পনের দিনের নিয়তে বের হলো কিন্তু কোন বিশেষ কারনে আজ যাচ্ছি কাল যাচ্ছি করে পনের দিনের বেশী থাকা হয়ে যেতো তাহলেও তাকে কসর নামায পড়তে হবে।

সফরে থাকা অবস্থায় নামাযের রাকাআত সংখ্যা

সফরের সময় ৪ রাকা’আত ফরয (যোহর+আসর+এশা) নামায ২ রাকা’আত পড়তে হয়, কিন্তু ২/৩ রাকা’আত ফরয নামায ২/৩ রাকা’আতই পড়তে হয়। একে নামায “কসর” বা সংক্ষিপ্ত করা বলা হয়।
১.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরে রওয়ানা করতেন, তখন সফর শেষে মদীনায় ফিরে আসা পর্যন্ত চার রাকা’আতের নামায সমূহ কসর (হ্রাস) করে দুই রাকা’আত পড়তেন। সফরে তিনি চার রাকা’আত পুরো পড়েছেন বলে প্রমাণ নেই।
২.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন-তিনি বলেন, আল্লাহতায়ালা তোমাদের রাসূলের ভাষায় নিজ বাসস্থানে চার রাকা’আত, সফরে দুই রাকা’আত এবং ভয়ের সময় এক রাকা’আত (অর্থাৎ জামায়াতের সাথে এক রাকা’আত) নামায ফরয করেছেন। (সহীস মুসলিম, সুনানে নাসাঈ, তাবরানী)
৩. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু উভয় থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেছেন : রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে দুই রাকা’আত নামায পড়ার নিয়ম প্রবর্তন করেছেন। এই দুই রাকা’আত মূলত পূর্ণ নামায, হ্রাসকৃত নয় (বরং আবাসের নামায দুই রাকা’আত বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাছাড়া রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বিতির নামাযও পড়তেন। (ইবনে মাজাহ)
৪.ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে অনেক যুদ্ধে শরীক হয়েছি। মক্কা বিজয়কালও আমি তাঁর সাথে ছিলাম। এ সময় তিনি মক্কায় আঠার রাত অবস্থান করেন, এ সময় তিনি নামায দুই রাকা’আত করে পড়েছেন। (আবু দাউদ)
৫.আল্লাহতায়ালা প্রথমত, প্রতি ওয়াক্ত নামাযই দুই রাকা’আত করে ফরয করেছেন। অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করে মদীনায় এলেন, তখন আবাসে নামাযের রাকা’আত সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। আর প্রবাসের (সফরের) নামায পূর্ববৎ বহাল রাখা হয়।
৬.হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মক্কা মুআয্যামার দিকে গিয়েছি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক ফরয নামায দুই রাকা’আত করে পড়তেন। (সহীহ মুসলিম, সহীহ আল বুখারী, আবু দাঊদ, তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ)
৭.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে রিওয়ায়াত করেন-তিনি বলেন, আমি মিনায় রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার পিছে প্রত্যেক ফরয নামায দুই রাকআত করে পড়েছি। হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খিলাফাতের প্রাথমিক সময়েও অনুরূপ পড়েছি। পরবর্তী সময়ে হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পূর্ণ পড়া শুরু করেছেন। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সুনানে নাসাঈ)
৮.হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে রিওয়ায়াত করেন-তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে দুই রাকা’আতই ফরয করেছেন, যেমন নিজ বাসস্থানে চার রাকা’আত ফরয করেছেন।” (তাবরানী)
৯.হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে রিওয়ায়াত করেন- তিনি বলেন, সফরের নামায দুই রাকা’আত, চাশতের নামায দুই রাকা’আত, ঈদুল ফিতরের নামায দুই রাকা’আত, জুমুআর নামায দুই রাকা’আত। এ দুই রাকা’আত হলো পরিপূর্ণ অসম্পূর্ণ নয়। আর তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাতৃভাষাতেই। (সুনানে নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হাব্বান)
১০.সাইয়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিায়াল্লাহু আনহু থেকে রিওয়ায়াত করেন-ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি সফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিছে দুই রাকা’আত নামায পড়েছি এবং হযরত আবূ বকর সিদ্দীক ও হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু এর পিছেও দুই রাকা’আত পড়েছি। পরবর্তীতে বিভিন্ন পন্থা তোমাদেরকে পৃথক করে দিয়েছে। আল্লাহর কসম! আমার আশা হলো চার রাকা’আতের পরিবর্তে কবূলকৃত দুই রাকা’আত পাওয়া।
১১.উরওয়া ইবনে যুবায়ের থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (আমার খালা) আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: নামায দুই রাকা’আত করেই ফরয হয়। অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিজরত করার পর চার রাকা’আত ফরয করা হয়, তবে সফরের নামায আগের মতোই দুই রাকা’আত ফরয থাকে। ইমাম যোহরী বলেন, আমি উরওয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম: তবে আপনার খালা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু কেন সফরে চার রাকা’আত পড়তেন? জবাবে উরওয়া বলেন: এ ব্যাপারে তাঁর একটি ব্যাখ্যা ছিল, যেমন হযরত ওসমানের একটি ব্যাখ্যা ছিল। (সহীহ আল বুখারি ও সহীহ মুসলিম) ব্যাখ্যা দুইটি নিম্মরূপ-
ক) হযরত আয়েশার ব্যাখ্যা ছিল এই যে, তিনি মনে করতেন, সফরে ভয় ও সন্ত্রাসের সম্মুখীন হলেই নামায কসর করতে হবে, নতুবা নয়।
খ) হযরত উসমান একবার হজ্জের সময় মিনায় চার রাকা’আত নামায পড়েন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন : আমি এখানে এসে বিয়ে করেছি। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন কেউ সফরে গিয়ে কোথাও বিয়ে করলে, সে সেখানে মুকীম হয়ে যাবে এবং পূর্ণ নামায পড়বে।
এখানে উদাহরণস্বরূপ মাত্র কয়েকটি হাদীস পেশ করা হয়েছে। নচেৎ এ সম্পর্কে আসংখ্য হাদীস রয়েছে। উক্ত রিওয়ায়াতগুলো থেকে বুঝা যায় সফরে কসরই ফরয। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং খোলাফা-ই-রাশিদীন কসরই পড়েছেন, সাহাবায়ে কিরাম চার রাকা’আত পড়তে নিষেধ করেছেন কিংবা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
বিবেকের চাওয়াও এটা যে সফরে কসর ফরয। মুসাফিরকে কসর ও সম্পূর্ণকরণ উভয়ের স্বধীনতা দেয়া শরয়ী জ্ঞানের সম্পূর্ণ বিরোধী। কারণ সফরে প্রত্যেক চার রাকা’আত বিশিষ্ট নামাযে প্রথম দুই রাকা’আত সকলের ঐক্যমতে ফরয। এখন শেষ দুই রাকা’আত সম্পর্কে প্রশ্ন হলো তাও মুসাফিরের উপর ফরয কি না? যদি ফরয হয় তাহলে তা না পড়ার সুযোগ কি ভাবে থাকবে? ফরযের ক্ষেত্রে কোন স্বাধীনতা নেই। ফরয ও ইচ্ছাধীনতা একত্রিত হতে পারে না। আর যদি ফরয না হয়ে নফল হয়, তাহলে একই তাকবীরে তাহরীমায় ফরয ও নফল নামায আদায় শরীআতের নিয়মবিরুদ্ধ, যার উদাহরণ কোথাও পাওয়া যাবে না। ফরয ও নফলের তাকবীরে তাহরীমা ভিন্ন ভিন্ন। একটি তাকবীরে তাহরীমায় এক ধরণের নামাযই হতে পারে দুইরকম নয়।
যে ভাবেই হোক, দুই রাকা’আত কিংবা চার রাকা’আত পড়ার স্বাধীনতা শরয়ী জ্ঞানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মোট কথা যে ভাবে নিজ বাসস্থানে চার রাকা’আতই ফরয, হ্রাস-বৃদ্ধির স্বাধীনতা নেই তদ্রুপ সফরে কেবল মাত্র দুই রাকা’আতই পড়া আবশ্যক কোন রূপ এখতিয়ার ছাড়াই।
ফরয নামাযের আগে পরে যেসব নফল পড়া হয়েছে সেগুলো ছিলো সাধারণ নফল, ফরয নামাযের সাথে সম্পর্কিত নয়। কারণ মুসাফিরর সুবিধার জন্যে যে ফরয নামাযই হ্রাস করে দুই রাকা’আত করা হয়েছে, সেখানে ফরযের আগে পরে সুন্নাত নামাযের রীতি চালু রাখার তো কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। এমনটি হলে তো ফরয নামায পূর্ণ করাই উত্তম ছিলো। এজন্যেই আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন : সফরে ফরযের আগে পরে সুন্নাত নামায পড়ার দরকার হলে তার চাইতে ফরয নামাযই (কসর না করে) পূর্ণ করতাম।
শরীআতের মাসআলা হলো, মুসাফিরের উপর চার রাকা’আত বিশিষ্ট ফরয নামাযে, কসর ফরয। মুসাফির উক্ত নামায সম্পূর্ণ পড়তে পারবে না। যদি ভুলে দুই রাকা’আতের পরিবর্তে চার রাকা’আত পড়ে নেয় তার হুকুম হবে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে ফজরের ফরয চার রাকা’আত পড়েছে। অর্থাৎ যদি সে প্রথম তাশাহহুদ পাঠ করে তৃতীয় রাকাআতে দাড়িয়ে যায়, তা হলে সে সাহু সিজদা দিবে। নচেৎ নামায পুনরায় আদায় করবে। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে দুই রাকা’আতের স্থলে চার রাকা’আত পড়ে তাহলে নামায আদায় হবে না। কেউ যদি মনে করে সফরে নামায কসর করবেনা পুরা পড়লে বেশী সওয়াব হবে, তাহলে তার নামাযই হবেনা। কারন এটা আল্লাহর হুকুম।

সফরে থাকায় অবস্থায় ওয়াক্ত ফরয নামাযের সুন্নাত

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে সুন্নাত পড়তেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে চার রাকা’আতের ফরয নামায হ্রাস করে দুই রাকা’আত পড়তেন। সফরে তিনি বিতির এবং ফজরের সুন্নাত ছাড়া ফরয নামাযের আগে পরের আর কোনো সুন্নাত নামায পড়েছেন বলে প্রমাণ নেই। হ্যাঁ, বিতির এবং ফজরের সুন্নাত তিনি আবাসে প্রবাসে সব সময়ই পড়তেন।
১.সফরে সুন্নাত পড়া সম্পর্কে হযরত আবদল্লাহ ইবনে ওমরকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন : আমি সব সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সফর সঙ্গী থেকেছি। কিন্তু তাঁকে তাসবীহ (সুন্নাত নাময) পড়তে দেখিনি। তিনিই আমাদের আদর্শ এবং অনুসরণীয়। আল্লাহতায়ালা বলেন : “অবশ্যি আল্লাহর রসূলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ।”
২.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মিনায় নামায কসর করতেন নিজের বিছানায় চলে আসতেন, হযরত হাফ্সা বললেন, চাচাজান ! যদি কসর করার পর দুই রাকা’আত সুন্নাত আদায় করতেন তাহলে কত ভাল হত। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যদি সুন্নাত পড়া দরকার হত তাহলে আমি ফরযকে পূর্ণ করে নিতাম। (সহীহ মুসলিম)।
রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে থাকা অবস্থায় ৫ ওয়াক্তের সাথে সংশ্লিষ্ট সুন্নাত নামাযগুলো পড়তেন না, ফজরের ২ রাকা’আত সুন্নাত আর বিতির নামায ছাড়া। তাই আমাদেরও উচিত হবেনা, রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করেন নি সেটা করা। সফর অবস্থায় সুন্নাত নামায পড়া জরুরী নয়। কেউ যদি সুন্নাত নামায আদায় করতে চায় তাহলে সে নফলের সওয়াব পাবে। সুন্নতের সওয়াব পাবে না।

যানবাহনে নামায পড়ার নিয়ম

পূর্বে সফরের জন্য যানবাহন ছিল পশু অথাৎ ঘোড়া, উট, গাধ ইত্যাদি। বর্তমানে সময়ে জন্য হলো বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও উড়ো জাহাজ। পূর্বে যেহেতু যানবাহনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায আদায় কেরেছেন আমাদেরকেও যানবাহনে সে ভাবে নামায আদায় করতে হবে। নামায না পড়ার কোন অবকাশ নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যানবাহনে নামায কি ভাবে পড়েছেন তা নি¤েœ বনর্ণা করা হলো-
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রীতি ছিলো যে, তিনি যখন সোয়ারী বা যানবাহনে ভ্রমনরত থাকতেন, তখন বাহনের উপরই নফল নামায পড়তেন। এ সম্পর্কে বুখারী ও মুসলিম সহ অন্যান্য গ্রন্থে ইবনে ওমর, জাবের, আমের প্রমূখ রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ফরয নামাযের জন্যে যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামায়াত কায়েম করতেন আর তখন কার বাহন পশুর পিঠে জামায়াত কায়েম করা সম্ভব ছিলনা, তাই ফরয নামাযের সময় বাহন থেকে নেমে জামায়াত কায়েম করতেন। বাহন যে দিকেই চলতো, ঘুরতো, স্বাভাবিকভাবে তিনি সেদিকে ফিরেই নামায পড়তেন। এ সময় তিনি ইশারায় মাথা নুইয়ে রুকূ সেজদা করতেন। তবে রুকূর চাইতে সেজদায় মাথা বেশি নোয়াতেন।
২. হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সওয়ারীর উপর নামায পড়ার ইচ্ছা করতেন তখন তাকে কেবলা মুখী করে নিতেন। নিয়ত বাঁধার পর সওয়ারী যে দিকে যেতে চাইত যেতে দিতেন এবং নিজে নামায পড়ে নিতেন। (আবু দাউদ)।
৩. হযরত মালেক ইবনে হুয়াইরিছ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, দুই ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, যখন নামাযের সময় হবে তখন আযান দিবে এবং তোমাদের মধ্যে যে বড় সে নামায পড়াবে। (সহীহ আল বোখারী)
৪. আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি বর্ণনা উদ্ধৃতি হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, তাকবীরে তাহরীমার সময় তিনি বাহনকে কিবলামুখী করে নিতেন। তারপর বাকি নামায বাহন যেদিকে যেতো সেদিকে ফিরেই পড়তেন। (মুসনাদে আহম এবং আবু দাউদ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাহনে নামায পড়ার বিষয়ে অন্য যারা বর্ণনা করেছেন তাদের সকলের বর্ণনার মধ্যে মিল আছে। তাঁরা সকলেই বলেছেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহনে নামায পড়েছেন এবং বাহন যে মুখী হতো, তিনিও সে মুখীই নামায পড়তেন।” এসব বর্ণনায় তারা এমন কোনো কথা উল্লেখ করেননি যে, তাকবীরে তাহরীমার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহনকে কিবলামুখী করে নিতেন। এসব হাদীস বর্ণনা করেছেন আমের ইবনে রাবীয়া, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, জাবের ইবনে আবদল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুম। এই হাদীসগুলো আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত উক্ত হাদীস থেকে অধিকতর সহীহ-শুদ্ধ।
৫. বৃষ্টির সময় এবং কাদামাটির স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিগণকে সাথে নিয়ে ফরয নামাও যানবাহনে পড়েছেন। অবশ্য এ বিষয়ে একাধিক সূত্রের বর্ণনা নেই। কেবল একজন সাহাবিই এ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। এই হাদীসটি মুসনাদে আহমদ, জামে আত তিরমিযি ও নাসায়ীদে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি হলো : একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিগণকে নিয়ে একটি অপ্রশস্ত জায়গায় উপনীত হন। সেখানে তাঁদের উপর থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল আর নিচে ছিলো কাদামাটি। এমন সময় নামাযের ওয়াক্ত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশে মুয়াযযিন আযান এবং একামত দিলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের বাহনে করে সবার সামনে চলে গেলেন এবং ঈমাম হিসেবে সাহাবিগণকে সাথে নিয়ে নামায পড়েন। তাঁরা সবাই নিজ নিজ বাহন থেকে নামায পড়েন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশারায় রুকূ-সেজদা করেন। তবে রুকূর চাইতে সেজদায় মাথা অধিকতর নিচু করেন।” ঈমাম তিরমিযি বলেছেন হাদীসটি গরীব। অর্থাৎ এক পর্যায়ে হাদীসটির বর্ণনাকারী মাত্র একজন ছিলেন। এক পর্যায়ে উমর ইবনে ডিরমাহ একাই হাদীসটির বর্ণনা করেছেন। অবশ্য হযরত আনাস বাহনে ফরয নামায পড়েছেন বলে প্রমাণ আছে। হাদীসটি একক সূত্রে বর্ণিত হলেও যুক্তিগসংগত। কারণ, বাহন থেকে নেমে জমীনে জামায়াত কায়েম করার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিলে বাহনে নামায পড়াটাই যুক্তিসংগত। আধুনিক কালে যানবাহনের ক্ষেত্রে হাদীসটি খুবই প্রযোজ্য ।

সফরে থাকা অবস্থায় দুই ওয়াক্ত নামায একত্রে পড়া

সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে মুসাফির ও কসর সালাত অধ্যায়ে সফরে থাকা অবস্থায় দুই ওয়াক্ত নামায একত্রে পড়ার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। অধ্যায়টি পড়ে নিলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
দুই ওয়াক্ত নামায একত্রে পড়ার নাম জমা বাইনাস সালাতাইন। জমা বাইনাস সালাতাইন হলো আরবী শব্দ। এর অর্থ হল, দুই নামায একত্রে আদায় করা। যেমন, জোহর ও আসর, কিংবা মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করা। এটা দু’ভাবে হতে পারে –
এক.জমউত তাকদীম ও জমউত তাখীর।
দুই. জময়ে জাহিরী।
এক.‘জমউত তাকদীম’ ও ‘জমউত তাখীর’। ‘জমউত তাকদীম’ অর্থ হল-দ্বিতীয় নামাযকে এগিয়ে এনে প্রথম নামাযের সময়ে আদায় করা। যেমন যোহর ও আসরের নামায যোহরের সময় একত্রে আদায় করা আর ‘জমউত তাখীর’ অর্থ হল-প্রথম নামাযকে বিলম্বিত করে দ্বিতীয় নামাযের সময় আদায় করা। যথা মাগরিব ও এশার নামায এশার সময় একত্রে আদায় করা।
দুই. দ্বিতীয় পদ্ধতিকে বলা হয় ‘জময়ে জাহিরী’। এর অর্থ হচ্ছে প্রথম নামায তার ওয়াক্তের শেষ অংশে আর দ্বিতীয় নামায পরের ওয়াক্তের প্রথম অংশে আদায় করা। এভাবে বাহ্যত দুই নামায একত্রে পড়া হলেও কোনো নামাযকেই তার ওয়াক্ত থেকে সরানো হয়নি এবং যথা যোহরের নামাযের সময় যদি বেলা ১.০০ টা থেকে বিকাল ৪.০০ টা পর্যন্ত হয় এবং আসরের সময় ৪.০০ টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হয় তাহলে ‘জময়ে জাহিরী’ এভাবে হতে পারে যে, যোহরের মানায পৌনে ৪.০০ টায় আদায় করা হল আর আসরের নামায ৪.০০ টায় আদায় করা হল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রীতি ছিলো, তিনি যদি সূর্য হেলার আগে সফরে বের হতেন তাহলে যোহর নামাযকে আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন। অতপর আসরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়তেন। যদি সূর্য হেলার পর সফরে রওয়ানা করতেন, তাহলে যোহরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়ে রওয়ানা করতেন।
যদি মাগরিবের সময় তাড়াহুড়া করে যাত্রা শুরু করতেন, তাহলে মাগরিবের নামাযকে বিলম্বিত করে এশার সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তেন।
১.ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া (র) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন ভয়-ভীতি ও সফর ছাড়াই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর ও আসরের সালাত এবং মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে আদায় করেন। (সহীহ মুসলিম)
২.আহমাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ইউনুস (র) মু’আয রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বের হই। সে সময় তিনি যোহর ও আসর একত্রে এবং মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করেন। (সহীহ মুসলিম)
৩.ইয়াহিয়া ইবনে হাবীব (র) মু’আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধের সময় যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে আদায় করেন। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তার এইরহুপ করার কারণ কি? তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর উম্মাত যেন কষ্টে না পড়ে। (সহীহ মুসলিম) অর্থাৎ প্রত্যেকটি সালাত নিজ ওয়াক্তে প্রথম সালাত শেষ ওয়াক্তে এবং পরের সালাত আউয়াল ওয়াক্তে আদায় করেছেন, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে একত্রে আদায় করা হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে এরুপ একত্রে আদায় জায়েয ।
৪.আবু বকর ইবনে আবু শায়বা (র) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে আট রাকা’আত একত্রে এবং সাত রাকা’আত একত্রে আদায় করেছি। আমি বললাম হে আবু শা’সা! আমার মনে হয়, তিনি যোহরের সালাত বিলম্বে এবং আসরের সালাত ত্বরানিত করেছেন। অনুরূপভাবে মাগরিবের সালাত বিলম্ব করে এবং এশার সালাত ত্বরানিত করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমিও তাই মনে করি। (সহীহ মুসলিম)
৫.আবুর রাবী আয যাহরানী (র) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আট রাকা’আত ও সাত রাকা’আত অর্থাৎ যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করেছেন। (সহীহ মুসলিম)
৬.আবুর রাবী আয যাহরানী (র) আব্দুল্লাহ ইবনে শাকীক (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক দিন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু আসরের পরে আমাদের খূতবা দেন এমন কি সূর্য-ডুবে গেল এবং তারকা সমূহ প্রকাশ ফেল। লোকেরা বলতে লাগল, আস সালাত, আল সালাত। বনী তামীমের এক ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে এসে অন্য দিকে না তাকিয়ে অবিরাম বলতে লাগল, আস সালাত, আস সালাত । ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমার সর্বনাশ হোক, তুমি আমাকে সুন্নাতের শিক্ষা দিচ্ছ? তারপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি যে, তিনি যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে শাকীক (র) বলেন, তা শুনে আমার অন্তরে কিছু খটকা লাগল। তারপর আমি হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি ইবনে আব্বাসের বিবরণটির সত্যতা স্বীকার করলেন। (সহীহ মুসলিম)
৭.ইবনে আবু উমর (র) আব্দুল্লাহ ইবনে শাকীক উকায়লী (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন-আস সালাত, তিনি নীরব রলেন। সে আবার বলল, আস সালাত। তিনি নীরব রলেন। লোকটি আবার বলল, আস সালাত। তিনি এবারও নীরব রলেন। তারপর তিনি বললেন, তোমার সর্বনাশ হোক। তুমি কি আমাকে সালাত শিক্ষা দিচ্ছ? আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় দুই সালাত একত্রে আদায় করতাম। (সহীহ মুসলিম)
৮.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাবুক সফল সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়েছে : তাবুক সফরে কোনো মনযিল থেকে রওয়ানা করার প্রাক্কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি সূর্য হেলার পরে ওয়ানা করতেন, তবে যোহরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়ে রওয়ানা করতেন। যদি সূর্য হেলার পূর্বে যাত্রা করতেন, তবে যোহরকে বিলম্বিত করে আসরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়তেন। মাগরিব এবং এশার ক্ষেত্রেও অনুরূপ করতেন।
৯.হাকিম বলেছেন, আমার কাছে আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ বালূবিয়া বর্ণনা করেছেন, তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন মূসা ইবনে হারুণ, তার কাছে বর্ণনা করেছেন কুতাইবা ইবনে সায়ীদ, তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন লাইছ ইবনে সা’আদ, তিনি শুনেছেন ইয়াযীদ ইবনে আবি হাবিব থেকে, তিনি শুনেছেন আবু তুফাইল থেকে, তিনি মুয়ায ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে। মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন : তাবুক যুদ্ধের সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই (কোনো মনযিল থেকে) সূর্য হেলার পূর্বে রওয়ানা করতেন, তখন যোহর ও আসর একত্রে পড়তেন। যদি সূর্য হেলার পরে রওয়ানা করতেন, তবে (যোহরে সময়) যোহর ও আসর একত্রে পড়ে রওয়ানা করতেন। যদি সূর্যাস্তের পূর্বে রওয়ানা করতেন, তবে মাগরিব নামাযকে এশা পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন এবং এশার সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তেন। যদি সূর্যাস্তের পরে রওয়ানা করতেন তবে এশাকে এগিয়ে এনে মাগরিবের সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়ে রওয়ানা করতেন।” হাকিম বলেছেন, এই হাদীসটি একদল বিশস্ত (হাদিসের) ঈমাম বর্ণনা করেছেন। হাদীসটিতে কোনো প্রকার ত্রুটি কিংবা দুর্বলতা নেই। হাদীসটি আবু দাউদ এবং জামে আত তিরমিযিতেও বর্ণিত হয়েছে। যারা হাদীসটিতে ত্রুটি আছে বলে উল্লেখ করেছেন, তারা মূলত এই হাদীসের একজন রাবির ব্যাপারে কথা তুলেছেন। সেই রাবি সম্পর্কে তাঁরা ভুলবশতই সমালোচনা করেছেন। ঈমাম মুসলিমসহ হাদিসের ইমামগণ তার বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া হাদীসটির বক্তব্য যে সঠিক তার প্রমাণ আরো অনেকগুলো হাদীস থেকে পাওয়া যায়। সহীহ বুখারীতে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে থাকাকালে যোহর ও আসর নাময একত্রে পড়তেন এবং মাগরিব আর এশা একত্রে পড়তেন।”
১০.সহীহ আল বুখারীতে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তেন। বুখারীতে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য হেলার পূর্বে যাত্রা করলে যোহরকে আসর পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন এবং আসরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়তেন। বুখারীতে সালিম থেকে বর্ণিত, সফরের কষ্টের কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও এশার নাময একত্রে পড়তেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও অনুরূপ বক্তব্য সম্বলিত হাদীস বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
ঈমাম ইবনে তাইমিয়া দুই নাময একত্রে পড়ার হাদীস সমূহ বিশ্লেষণ করে বলেছেন, সফরে কোনো স্থানে অবস্থানের সময়, যখন কষ্ট থাকেনা, তখনো দুই নামায একত্রে পড়া বৈধ। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফায় অবস্থানকালে যোহর ও আসর একত্রে পড়েছেন। তাছাড়া সফরে যদি কষ্ট এবং প্রয়োজন দেখা দেয়, সে অবস্থায় দুই নামায একত্রে পড়া তো উত্তম কাজ।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ, ইমাম শাফেয়ী রহ. ও ইমাম মালিক রহ. বলেছেন, দুই নাময একত্রে করার বিষয়টি সাধারণভাবে সফরের সাথে জড়িতে। কোনো বিশেষ ধরনের সফরের সাথে দুই নাময একত্র করার বিষয়টি খাস (নির্দিষ্ট) নয়।
ইমাম আবু হানীফা রহ. একত্র করার বিষয়টি শুধু আরাফার জন্যে খাস বলে মনে করেন।
উম্মতের অধিকাংশ পূর্বসূরীগণ (সালফে সালেহীন) সব ধরনের ছোট বড় সফরেই নামায কসর ও একত্র করতেন ।

সফরে যোহর আসর একত্রে পড়া

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রীতি ছিলো, তিনি যদি সূর্য হেলার আগে সফরে বেরহতেন তাহলে যোহর নামাযকে আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন। অতপর আসরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়তেন। যদি সূর্য হেলার পর সফরে রওয়ানা করতেন, তাহলে যোহরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়ে রওয়ানা করতেন।
১. হযরত মুয়ায ইবনে জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তাবুক যুদ্ধের সময় সফর শুরু করার পুর্বে সূর্য ঢলে যেত তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর-আসর একত্রে পড়ে নিতেন। আর যদি সুর্য ঢলার পূর্বে সফরের ইচ্ছা করতেন তখন যোহরের নামাযকে বিলম্ব করে আছরের সময় যোহর ও আসর উভয় নামায পড়তেন।
২. হযরত ইমরান ইবনে হুছাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক সফরে ঘরে ফিরে আসা পর্যন্ত নামাযকে কসর করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঠার দিন মক্কা শরীফে ছিলেন। সেখানে মাগরিব ব্যতিত সব নামায দুই-দুই রাকা’আত পড়াতেন। সালাম ফিরার পর বলতেন, হে মক্কাবাসী! তোমরা নিজ নিজ নামায পুরা কর, আমরা মুসাফির। (মুসনাদে আহমদ)
৩. হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুযদালাফায় আসলেন তখন মাগরিব-এশা এক আযান ও দুই একামত দিয়ে পড়েছিলেন। উভয় নামাযের মধ্যে কোন সুন্নাত পড়েননি। (সহীহ মুসলিম ও নাসাঈ)।
৪. কুতায়বা ইবনে যাঈদ (র) আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সূর্য ঢলে যাওয়ার সময় সফর করতেন, তখন যোহরের সালাত আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত বিলম্ভ করতেন। তারপর অবতরণ করে এ দুই সালাত একত্রে আদায় করতেন। আর যদি সূর্য ঢলে যাওয়ার পর রওনা দিতেন, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফর অবস্থায় দুই সালাত একত্রে আদায় করার ইচ্ছা করতেন, তখন যোহরের সালাত আসরের প্রথম ওয়াক্ত আসা পর্যন্ত বিলম্ভ করতেন। এরপর উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন। (সহীহ মুসলিম)
৫. আবু তাহের ও আমর ইবনে নাওয়াদ (র) আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যখন সফরে তাড়াহুড়ো থাকত, তখন তিনি যোহরের সালাত আসরের প্রথম ওয়াক্ত আসা পর্যন্ত-বিলম্ব করতেন। তারপর উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন। মাগরিবের সালাতে বিলম্ব করতেন এমনকি লালিমা অস্তমিত হওয়ার সময় হলে মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করতেন। (সহীহ মুসলিম)
৬. ইয়াহিয়া ইবনে হাবীব হারীসি (র) সাঈদ ইবনে যুবায়ের (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধে সফরকালে যোহর ও আসর এবং মাগরিব এশা একত্রে আদায় করেন । সাঈদ বলেন, আমি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁকে তা করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছিল? তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য তার উম্মাত যেন কষ্টে না পড়ে। (সহীহ মুসলিম)

  সফরে মাগরিব ও এশা একত্রে পড়া

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রীতি ছিলো, তিনি যদি সূর্যাস্তের আগে সফরে বের হতেন তাহলে মাগরিবের নামাযকে এশার ওয়াক্ত পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন। অতপর এশার সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তেন। যদি সূর্যাস্তের পর সফরে রওয়ানা করতেন, তাহলে মগারিবের সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়ে রওয়ানা করতেন।
যদি মাগরিবের সময় তাড়াহুড়া করে যাত্রা শুরু করতেন, তাহলেও মাগরিবের নামাযকে বিলম্বিত করে এশার সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তেন।
১.ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া (র) ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যখন সফরে তাড়াহুড়ো থাকত তখন মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে আদায় করতেন।(সহীহ মুসলিম)
২.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কসরের নামায একসাথে পড়তেন। এমনিভাবে যদি সফর শুরু করার পুর্বে সুর্য ডুবে যেত তখন মাগরিবের সময় মাগরিব-এশা একত্রে পড়ে নিতেন। আর যদি সূর্য ডুবে যাওয়ার পূর্বে সফর শুরু করতেন তখন মাগরিবের নামায বিলম্ব করতেন এবং এশার সময় উভয় নামায পড়ে নিতেন। (আবু দাউদ ও জামে আত তিরমিজি) ।
৩.মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না (র) নাফি’ (র) থেকে বর্ণিত। ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর যখন তাড়াহুড়া থাকত তখন পশ্চিমাকাশের লালিমা অস্তমিত হওয়ার পর মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে আদায় করতেন এবং বলতেন, তাড়াহুড়ার সফরের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করতেন। (সহীহ মুসলিম)
৪.ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া (র) কুতায়বা ইবনে সাঈদ (র) আবু বকর ইবনে আবু শায়বা (র) ও আমর ইবনে নাকীদ (র) সালিমের পিতা (ইবনে ওমর) থেকে বর্ণিত যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, যখন তাঁর সফরে তাড়াহুড়া থাকত, তখন তিনি মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করতেন। (সহীহ মুসলিম)
৫.হারমালা ইবনে ইয়াহিয়া (র) আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, যখন তাঁর সফরে হাড়াহুড়ো থাকত তখন মাগরিবের সালাত দেরীতে আদায় করতেন। পরে মাগরিবের সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তেন।
৬.আবু তাহের ও আমর ইবনে নাওয়াদ (র) আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যখন সফরে তাড়াহুড়ো থাকত, তখন তিনি যোহরের সালাত আসরের প্রথম ওয়াক্ত আসা পর্যন্ত-বিলম্ব করতেন। তারপর উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন। মাগরিবের সালাতে বিলম্ব করতেন এমনকি লালিমা অস্তমিত হওয়ার সময় হলে মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করতেন। (সহীহ মুসলিম)
৭.ইয়াহিয়া ইবনে হাবীব হারীসি (র) সাঈদ ইবনে যুবায়ের (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধে সফরকালে যোহর ও আসর এবং মাগরিব এশা একত্রে আদায় করেন । সাঈদ বলেন, আমি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁকে তা করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছিল? তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য তার উম্মাত যেন কষ্টে না পড়ে। (সহীহ মুসলিম)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা গেল সফরে দুই ওয়াক্ত নামায পড়ার ২টি নিয়ম রয়েছে।
একটি হলো-সূর্য হেলার আগে সফরে বের হলে যোহরকে বিলম্বিত করে আছরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়া যায়।
দ্বিতীয়টি হলো-সূর্য হেলার পরে সফরে বের হলে আসরকে এগিয়ে নিয়ে এসে যোহরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়া যায়।
অনুরূপ ভাবে-
১.সূর্যাস্তের আগে সফরে বের হলে মাগরিবকে বিলম্বিত করে এশার সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়া যায়।
২. সূর্যাস্তের পরে সফরে বের হলে এশাকে এগিয়ে নিয়ে এসে মাগরিবের সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়া যায়।
সফরে থাকা অবস্থায় একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

দুই বা তিন রাকা’আত বিশিষ্ট নামাযে কসর নেই

দুই বা তিন রাকা’আত বিশিষ্ট নামাযে কসর নেই। যেমন- ফজর ও মাগরিবের নামায এবং বিতর নামায।
রাসূলল্লাহু সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সকল সফরের নামায দুই রাকা’আত করে পড়েছেন। সুতরাং আমাদেরও শুধু উচিৎ নয় বরং আবশ্যিকভাবে সফরে চার রাকা’আত নামায দুই রাকা’আত করে পড়া।

সফরে নফল নামায

১.হযরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বিতর এবং রাত্রের নফল নামায সোয়ারীর পিঠে এশারা করে পড়তেন। তবে ফরয নামায সোয়ারীর পিঠে পড়তেন না। (সহীহ আল বুখারি ও সহীহ মুসিলম)
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেছেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমল থেকে একথা প্রমাণিত যে, তিনি সফরে নামায কসর করতেন, রাত্রে নফল নামাযও পড়তেন।
২.হযরত আমের ইবনে রাবীয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সফরকালে রাত্রিবেলায় সোয়ারীর পিঠে বসে নফল নামায পড়তে দেখেছি। আসলে এটা ছিলো কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ নামায। (সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিম)
ইমাম আহমদকে সফরে নফল পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন : আমি আশা করি সফরে নফল পড়লে কোনো দোষ হবেনা।
৩.হযরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাহাবিগণকে সফরে ফরয নামাযের আগে পরে নফল নামায পড়তেন। হযরত ওমর, আলী, ইবনে মাসউদ, জাবের, আনাস, ইবনে আব্বাস, আবুযর রাদিয়াল্লাহু আনহুম অনুরূপ করতেন বলে বর্ণিত হয়েছে।
৪.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সফরে ফরয নামাযের আগে পরে কোনো সুন্নাত নামায পড়তেন না। কেবল শেষ রাত্রে বিতর ও তাহাজ্জুদ পড়তেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রীতি এই ছিলো যে, তিনি সফরে ফরয নামায কসর করতেন এবং ফরযের আগে পরে আর কোনো নামায পড়তেন না।

আসুন আমরা সবাই ইসলামী আইন মেনে চলি, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের চেষ্টা করি, কুরআন পড়ি, কুরআন মানি, কুরআনের আলোকে স্ন্দুর একটা জীবন গড়ে তুলি।

You may also like