Home ইসলাম সফরে থাকা অবস্থায় দুই ওয়াক্ত নামায একত্রে পড়া

সফরে থাকা অবস্থায় দুই ওয়াক্ত নামায একত্রে পড়া

by admin
০ comment

সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে মুসাফির ও কসর সালাত অধ্যায়ে সফরে থাকা অবস্থায় দুই ওয়াক্ত নামায একত্রে পড়ার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। অধ্যায়টি পড়ে নিলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
দুই ওয়াক্ত নামায একত্রে পড়ার নাম জমা বাইনাস সালাতাইন। জমা বাইনাস সালাতাইন হলো আরবী শব্দ। এর অর্থ হল, দুই নামায একত্রে আদায় করা। যেমন, জোহর ও আসর, কিংবা মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করা। এটা দু’ভাবে হতে পারে –
এক.জমউত তাকদীম ও জমউত তাখীর।
দুই. জময়ে জাহিরী।

এক.‘জমউত তাকদীম’ ও ‘জমউত তাখীর’। ‘জমউত তাকদীম’ অর্থ হল-দ্বিতীয় নামাযকে এগিয়ে এনে প্রথম নামাযের সময়ে আদায় করা। যেমন যোহর ও আসরের নামায যোহরের সময় একত্রে আদায় করা আর ‘জমউত তাখীর’ অর্থ হল-প্রথম নামাযকে বিলম্বিত করে দ্বিতীয় নামাযের সময় আদায় করা। যথা মাগরিব ও এশার নামায এশার সময় একত্রে আদায় করা।

দুই. দ্বিতীয় পদ্ধতিকে বলা হয় ‘জময়ে জাহিরী’। এর অর্থ হচ্ছে প্রথম নামায তার ওয়াক্তের শেষ অংশে আর দ্বিতীয় নামায পরের ওয়াক্তের প্রথম অংশে আদায় করা। এভাবে বাহ্যত দুই নামায একত্রে পড়া হলেও কোনো নামাযকেই তার ওয়াক্ত থেকে সরানো হয়নি এবং যথা যোহরের নামাযের সময় যদি বেলা ১.০০ টা থেকে বিকাল ৪.০০ টা পর্যন্ত হয় এবং আসরের সময় ৪.০০ টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হয় তাহলে ‘জময়ে জাহিরী’ এভাবে হতে পারে যে, যোহরের মানায পৌনে ৪.০০ টায় আদায় করা হল আর আসরের নামায ৪.০০ টায় আদায় করা হল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রীতি ছিলো, তিনি যদি সূর্য হেলার আগে সফরে বের হতেন তাহলে যোহর নামাযকে আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন। অতপর আসরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়তেন। যদি সূর্য হেলার পর সফরে রওয়ানা করতেন, তাহলে যোহরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়ে রওয়ানা করতেন। যদি মাগরিবের সময় তাড়াহুড়া করে যাত্রা শুরু করতেন, তাহলে মাগরিবের নামাযকে বিলম্বিত করে এশার সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তেন।

১.ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া (র) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন ভয়-ভীতি ও সফর ছাড়াই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর ও আসরের সালাত এবং মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে আদায় করেন। (সহীহ মুসলিম)

২.আহমাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ইউনুস (র) মু’আয রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বের হই। সে সময় তিনি যোহর ও আসর একত্রে এবং মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করেন। (সহীহ মুসলিম)

৩.ইয়াহিয়া ইবনে হাবীব (র) মু’আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধের সময় যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে আদায় করেন। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তার এইরহুপ করার কারণ কি? তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর উম্মাত যেন কষ্টে না পড়ে। (সহীহ মুসলিম) অর্থাৎ প্রত্যেকটি সালাত নিজ ওয়াক্তে প্রথম সালাত শেষ ওয়াক্তে এবং পরের সালাত আউয়াল ওয়াক্তে আদায় করেছেন, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে একত্রে আদায় করা হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে এরুপ একত্রে আদায় জায়েয ।

৪.আবু বকর ইবনে আবু শায়বা (র) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে আট রাকা’আত একত্রে এবং সাত রাকা’আত একত্রে আদায় করেছি। আমি বললাম হে আবু শা’সা! আমার মনে হয়, তিনি যোহরের সালাত বিলম্বে এবং আসরের সালাত ত্বরানিত করেছেন। অনুরূপভাবে মাগরিবের সালাত বিলম্ব করে এবং এশার সালাত ত্বরানিত করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমিও তাই মনে করি। (সহীহ মুসলিম)

৫.আবুর রাবী আয যাহরানী (র) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আট রাকা’আত ও সাত রাকা’আত অর্থাৎ যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করেছেন। (সহীহ মুসলিম)

৬.আবুর রাবী আয যাহরানী (র) আব্দুল্লাহ ইবনে শাকীক (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক দিন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু আসরের পরে আমাদের খূতবা দেন এমন কি সূর্য-ডুবে গেল এবং তারকা সমূহ প্রকাশ ফেল। লোকেরা বলতে লাগল, আস সালাত, আল সালাত। বনী তামীমের এক ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে এসে অন্য দিকে না তাকিয়ে অবিরাম বলতে লাগল, আস সালাত, আস সালাত । ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমার সর্বনাশ হোক, তুমি আমাকে সুন্নাতের শিক্ষা দিচ্ছ? তারপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি যে, তিনি যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে শাকীক (র) বলেন, তা শুনে আমার অন্তরে কিছু খটকা লাগল। তারপর আমি হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি ইবনে আব্বাসের বিবরণটির সত্যতা স্বীকার করলেন। (সহীহ মুসলিম)

৭.ইবনে আবু উমর (র) আব্দুল্লাহ ইবনে শাকীক উকায়লী (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন-আস সালাত, তিনি নীরব রলেন। সে আবার বলল, আস সালাত। তিনি নীরব রলেন। লোকটি আবার বলল, আস সালাত। তিনি এবারও নীরব রলেন। তারপর তিনি বললেন, তোমার সর্বনাশ হোক। তুমি কি আমাকে সালাত শিক্ষা দিচ্ছ? আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় দুই সালাত একত্রে আদায় করতাম। (সহীহ মুসলিম)

৮.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাবুক সফল সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়েছে : তাবুক সফরে কোনো মনযিল থেকে রওয়ানা করার প্রাক্কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি সূর্য হেলার পরে ওয়ানা করতেন, তবে যোহরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়ে রওয়ানা করতেন। যদি সূর্য হেলার পূর্বে যাত্রা করতেন, তবে যোহরকে বিলম্বিত করে আসরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়তেন। মাগরিব এবং এশার ক্ষেত্রেও অনুরূপ করতেন।

৯.হাকিম বলেছেন, আমার কাছে আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ বালূবিয়া বর্ণনা করেছেন, তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন মূসা ইবনে হারুণ, তার কাছে বর্ণনা করেছেন কুতাইবা ইবনে সায়ীদ, তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন লাইছ ইবনে সা’আদ, তিনি শুনেছেন ইয়াযীদ ইবনে আবি হাবিব থেকে, তিনি শুনেছেন আবু তুফাইল থেকে, তিনি মুয়ায ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে। মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন : তাবুক যুদ্ধের সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই (কোনো মনযিল থেকে) সূর্য হেলার পূর্বে রওয়ানা করতেন, তখন যোহর ও আসর একত্রে পড়তেন। যদি সূর্য হেলার পরে রওয়ানা করতেন, তবে (যোহরে সময়) যোহর ও আসর একত্রে পড়ে রওয়ানা করতেন। যদি সূর্যাস্তের পূর্বে রওয়ানা করতেন, তবে মাগরিব নামাযকে এশা পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন এবং এশার সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তেন। যদি সূর্যাস্তের পরে রওয়ানা করতেন তবে এশাকে এগিয়ে এনে মাগরিবের সময় মাগরিব ও এশা একত্রে পড়ে রওয়ানা করতেন।” হাকিম বলেছেন, এই হাদীসটি একদল বিশস্ত (হাদিসের) ঈমাম বর্ণনা করেছেন। হাদীসটিতে কোনো প্রকার ত্রুটি কিংবা দুর্বলতা নেই। হাদীসটি আবু দাউদ এবং জামে আত তিরমিযিতেও বর্ণিত হয়েছে। যারা হাদীসটিতে ত্রুটি আছে বলে উল্লেখ করেছেন, তারা মূলত এই হাদীসের একজন রাবির ব্যাপারে কথা তুলেছেন। সেই রাবি সম্পর্কে তাঁরা ভুলবশতই সমালোচনা করেছেন। ঈমাম মুসলিমসহ হাদিসের ইমামগণ তার বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া হাদীসটির বক্তব্য যে সঠিক তার প্রমাণ আরো অনেকগুলো হাদীস থেকে পাওয়া যায়। সহীহ বুখারীতে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে থাকাকালে যোহর ও আসর নাময একত্রে পড়তেন এবং মাগরিব আর এশা একত্রে পড়তেন।”

১০.সহীহ আল বুখারীতে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তেন। বুখারীতে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য হেলার পূর্বে যাত্রা করলে যোহরকে আসর পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন এবং আসরের সময় যোহর ও আসর একত্রে পড়তেন। বুখারীতে সালিম থেকে বর্ণিত, সফরের কষ্টের কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও এশার নাময একত্রে পড়তেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও অনুরূপ বক্তব্য সম্বলিত হাদীস বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

ঈমাম ইবনে তাইমিয়া দুই নাময একত্রে পড়ার হাদীস সমূহ বিশ্লেষণ করে বলেছেন, সফরে কোনো স্থানে অবস্থানের সময়, যখন কষ্ট থাকেনা, তখনো দুই নামায একত্রে পড়া বৈধ। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফায় অবস্থানকালে যোহর ও আসর একত্রে পড়েছেন। তাছাড়া সফরে যদি কষ্ট এবং প্রয়োজন দেখা দেয়, সে অবস্থায় দুই নামায একত্রে পড়া তো উত্তম কাজ।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ, ইমাম শাফেয়ী রহ. ও ইমাম মালিক রহ. বলেছেন, দুই নাময একত্রে করার বিষয়টি সাধারণভাবে সফরের সাথে জড়িতে। কোনো বিশেষ ধরনের সফরের সাথে দুই নাময একত্র করার বিষয়টি খাস (নির্দিষ্ট) নয়।
ইমাম আবু হানীফা রহ. একত্র করার বিষয়টি শুধু আরাফার জন্যে খাস বলে মনে করেন।
উম্মতের অধিকাংশ পূর্বসূরীগণ (সালফে সালেহীন) সব ধরনের ছোট বড় সফরেই নামায কসর ও একত্র করতেন ।

You may also like