Home ইসলাম যিকির অন্তরের মরিচা পরিষ্কার করে পর্ব-২

যিকির অন্তরের মরিচা পরিষ্কার করে পর্ব-২

by admin
০ comment

যিকির অন্তরের মরিচা পরিষ্কার করে পর্ব-২

মোহাম্মদ আবুল হোসাইন চৌধুরী

৭ যিকিরের গুরুত্ব
যিকির সর্ম্পকে কোরআনো ভাষ্য
৮ যিকির সর্ম্পকে হাদীসের ভাষ্য
৯ আল্লাহ যাকে যিকির করতে নিষেধ করেছেন
১০ যিকিরের সুফল ও উপকারিতা
১১ যিকির না করার ক্ষতিসমূহ

যিকিরের গুরুত্ব

সৃষ্টি কর্তা মহান আল্লাহতায়ালার আদেশ নিষেধ বা বেহেস্তের আনন্দ ও দোযখের শাস্তির কথা মনে থাকে না বা বিশ্বাস করে না। তার সামনে যতই হাদিস বা কোরআনের আয়াত বা কোরআনের কথা বলা হোক না কেন কোন কথাই তার মনে দাগ কাটে না। অর্থাৎ ধর্মের কথা শুনতে তার খারাপ লাগে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই মনের অসুস্থতা ও জং বা ময়লা কিভাবে দুর করা যায় এবং এগুলো আমদের ক্বলব বা মন থেকে দুর করতে পারলে কি উপকার হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : প্রতিটি বস্তু পরিস্কার করার জন্য একটি যন্ত্র বা রেত থাকে। তদ্রুপ মনের পরিচ্ছন্নতা আনার যন্ত্র হচ্ছে আল্লাহর যিকির বা ¯œরণ”। যিকির বা আল্লাহর ¯œরণ হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে অল্প আমলে অধিক সওয়াব পাওয়ার মাধ্যম। অপরদিকে যিকির হচ্ছে যাবতীয় ইবাদতের দেহ। অধিকন্তু আল্লাহতায়ালা তার ফেরেস্তাদের নিকটে তাদের স্মরণ করেন। অযুতে বা বিনা অযুতে উঠতে বসতে চলতে ফিরতে সব সময় আল্লাহর যিকির করা যায়। এর জন্য মানুষের কোন পরিশ্রমই করা লাগেনা। কোন অবসরের প্রয়োজন হয়না। কিন্তু এর সুফল এবং ফলশ্রæতি এত ব্যাপক যে আল্লহর স্মরণের মাধ্যমে পার্থিব কাজ কর্মও ইবাদতে রুপান্তরিত হয়। আহার গ্রহণের পূর্ববর্তী দোয়া, বাড়িতে ঢোকার ও বাড়ি থেকে বের হওয়ার দোয়া, কোন কাজের সূচনা ও পরিসমাপ্তির দোয়া প্রভৃতি দোয়ার তাৎপর্য্য ও সারমর্ম এই যে মোসলমান যেন কোন সময়ে আল্লাহর স্মরণে অমনোযোগী ও গাফেল হয়ে কোন কাজ না করে। কোন বিশেষ সময়েই নয় বরং সর্বক্ষন আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট এবং তার কন্ঠ আল্লাহর স্মরণে সিক্ত থাকলেই এর মাধ্যমে ইবাদত এবং অন্যান্য দ্বীনি কাজের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। মানুষের মধ্যে যখন এই অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন তার জীবনের ইবাদত এবং দ্বীনি কাজ ঠিক তেমনিভাবে বিকাশে লাভ করে যেমন একটি চারা গাছকে তার প্রকৃতির অনুকুল পরিবেশ ও আবহাওয়ায় রোপন করা হয়। পক্ষান্তরে যে জীবন আলাøহর স্মরণে শূন্য থাকে, সেখানে বিশেষ সময়ে এবং বিশেষ সুযোগ অনুষ্ঠিত ইবাদত এমন একটি চারা গাছের ন্যায় যাকে তার প্রকৃতির নিছক বাগানের মালিকের বিশেষ তত্ত¡াবধানে বেঁচে থাকে। একজন প্রকৃত মুসলমান কখনই আল্লাহর স্মরণবিহীন থাকতে পারে না। প্রাত্যাহিক ঘুমাতে যাওয়ার সময়ের দোয়া, ঘুম থেকে উঠে পড়ার দোয়া, অযু করার পূর্বের দোয়া, অযু শেষে দোয়া, গোসলের দোয়া, দৈনন্দিন প্রতিটি কাজের শুরুতে দোয়া পড়া। এই ভাবে একজন মুমিন ঘুম থেকে জেগে আবার ঘুমাতে যাওয়ার আগ মুহুত পর্যন্ত আল্লাহর নির্দেশিত ও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদর্শিত আমল সমূহ পর্যালোচনা করলে দিনে রাতে ২৪ ঘন্টাই আল্লাহর যিকির অথার্ৎ স্মরণ করতে পারে। বাস্তবে কোন অবৈধ পথ অবলম্বন করতে গেলেই আল্লহর স্মরণ হবে এবং অন্যায় ও অবৈধ কাজ করা থেকে বিরত থাকবে। উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে যিকিরের গুরুত্ব অপরিসীম এবং তার ফযিলতও অনেক বেশী। তাই এ সহজতর আমলটির ব্যাপারে উদাসীন না হয়ে, অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তা আদায়ের ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার। এখন প্রশ্ন, আমরা কী-ভাবে আল্লাহকে স্মরণ করতে পারি, যখন আমরা তাঁকে দেখতে সক্ষম নই; এবং তাঁর সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আমরা দৃশ্যায়িত করতে পারি না? আমরা তাঁর সৃষ্টির দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারি, কারণ সৃষ্টিসমূহই স্মরণ করিয়ে দেবে ¯্রষ্টাকে। সূরা আল ইমরানের : ১৯১-১৯১ আয়াতে এ কথার উল্লেখ আছে; এবং আলকুরআনের বহু আয়াত এই একই কথার সাক্ষ্য দিচ্ছে। মহাবিশ্বের যে অকল্পনীয় বিশালতা, সেদিকে আমরা যত-বেশী লক্ষ্য করব, তার নির্মাণকর্তা মহান আল্লাহর কথা ততবেশী মনে পড়বে। শুধু এইটুকু ভাবলেই শিহরিত হতে হয়, একটি বীজ অঙ্কুরিত হতেও কত বিবিধ শক্তির একত্রীভূত কী নিখুঁত সমš^য়ই না প্রয়োজন! কীভাবে এই বিশাল মহাবিশ্ব জটিল কিন্তু পূর্ণ-ভারসাম্য নিয়ে ক্রমাগত স¤প্রসারিত হচ্ছে, আর কী নিখুঁত এই ব্যবস্থাপনা! আমরা অধিকাংশই যথেষ্ট ভাগ্যবান যে, আমরা প্রতিদিনই আমাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য পাচ্ছি। এবিষয়টিকেও আমরা আমাদের বিবেচনায় আনতে পারি। কারণ খাদ্য-দ্রব্যের উৎপাদন, আহারযোগ্য খাবার প্রস্তুুতিকরণ, খাদ্য গ্রহণ, পরিপাকক্রিয়া ইত্যাদি মিলিয়ে আমাদের একগ্রাস খাবার মুখে তোলার মধ্যেও আল্লাহ পাকের কী বিরাট রহমত যে বিদ্যমান, আমরাতো উপলব্ধি করতে পারি। এটাও প্রজ্ঞার পরিচায়ক যে, একজন ব্যক্তি এটা অনুভব করে এবং সকৃতজ্ঞচিত্তে বলে ওঠে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর।
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে (মসজিদে নববীতে) উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তিনি বললেন, তোমাদের নিকট এখন একজন জান্নাতী মানুষ আগমন করবে। (বর্ণনাকারী বলেন) অতপর একজন সাহাবী আগমন করলেন। তাঁর দাড়ি থেকে সদ্যকৃত অযুর পানির ফোটা ঝরে পড়ছিল। তিনি তার বাম হাতে জুতা নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন। তার পরদিনও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে অনুরূপ কথা বললেন এবং প্রথমদিনের মতো সেই সাহাবী আগমন করলেন। যখন তৃতীয় দিন হল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই কথা আবার বললেন এবং যথারীতি সেই সাহাবী পূর্বের অবস্থায় আগমন করলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আলোচনা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই সাহাবীর অনুগামী হলেন। তিনি তাকে বললেন, আমি আমার পিতার সাথে ঝগড়া করে শপথ করেছি, তিনদিন পর্যন্ত তার ঘরে যাব না। এই তিনদিন আমাকে যদি আপনার ঘরে থাকার সুযোগ করে দিতেন, তবে আমি সেখানে থাকতাম। তিনি বললেন, হ্যাঁ, থাকতে পার। বর্ণনাকারী হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, তিনি তার সাথে সেখানে সেই তিন রাত অতিবাহিত করলেন। তিনি তাঁকে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ নামায পড়তেও দেখলেন না। তবে তিনি যখন ঘুমাতেন, বিছানায় পার্শ্ব পরিবর্তন করতেন তখন আল্লাহর যিকির করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তার মুখ থেকে কিন্তু ভালো কথা ছাড়া কোনো মন্দ কথা শুনিনি। যখন তিনদিন অতিবাহিত হয়ে গেল এবং তার আমলকে সাধারণ ও মামুলি মনে করতে লাগলাম, তখন তাকে বললাম, হে আল্লাহর বান্দা! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আপনার সম্পর্কে তিনবার একথা বলতে শুনেছি তিনি বললেন, তুমি যা দেখেছ, ঐ অতটুকুই। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন আমি ফিরে আসছিলাম তখন তিনি আমাকে ডাকলেন। তারপর বললেন, আমার আমল বলতে ঐ অতটুকুই, যা তুমি দেখেছ। তবে আমি আমার অন্তরে কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি না এবং আল্লাহতায়ালা কাউকে কোনো নেয়ামত দান করলে সেজন্য তার প্রতি হিংসা রাখি না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এ গুণই আপনাকে এত বড় মর্যাদায় উপনীত করেছে। আর সেটাই আমরা করতে পারি না। (মুসনাদে বাযযার, আলবিদায়া ওয়ান, আততারগীব ওয়াত তারহীব)

যিকির সর্ম্পকে কুরআনের ভাষ্য

সর্বাবস্থায় আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে আমাদের ক্বলব বা মন পরিষ্কার ও সুস্থ হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক বলেন : একমাত্র আল্লাহর যিকিরেই (মানুষের) ক্বলব (মন) প্রশান্তি লাভ করে। পবিত্র কোরআন পাকে যিকিরের অনেক উপকারিতার বর্ণনা আলোচিত হয়েছে। যেমন-
১.“আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণকারী এবং স্মরণকারিণী, আল্লাহ তাদের জন্য মাগফেরাত ও প্রতিদানের ব্যবস্থা রেখেছেন”। (আহযাব : ৩৫)।
২.“হে ঈমানদারগণ! ‘তোমরা অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো।” (আহযাব : ৪১-৪২) এ আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ফরজ, ওয়াজিব এবং অন্যান্য এবাদতসমূহ আদায় করার পর বেশি বেশি আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাকা। কেননা যখন অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকিরে অভ্যস্ত হবে এবং প্রত্যেহ সকাল-সন্ধ্যায় যিকির করবে, বিনিময়ে আল্লাহপাক যিকিরকারীর প্রতি অজ¯্র রহমত ও দয়া বর্ষণ করবেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও তাদের জন্যে দোয়া করেন।
৩“হে ঈমনদারগণ বেশি করে আল্লাহর যিকির কর। আর সকাল সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা ঘোষণা করো।” (হিযাব : ৪১-৪২)
৪.“নামাজ কায়েম করো আমার যিকিরের জন্য।” (ত্বহা : ১৪)
৫.“হযরত মুসা (আঃ) ও আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতে একবার বলেছেন “তাকে (আমার ভাইকে) আমার কাজে অংশীদার করুন। যাতে আমরা বেশী করে আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষনা করতে পারি এবং বেশী পরিমানে আপনাকে স্মরণ করতে পারি।” (ত্বহা: ৩২-৩৪)।
৬.“হযরত মুসা (আঃ) এর উদ্দেশ্যে আল্লাহপাক বলেছেন “(হে মুসা) তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনাবলীসহ যাও এবং আমার স্মরণে শৈথিল্য করো না।” (ত্বহা: ৪২)
৭.“সেই সকলকাম হবে, যে পবিত্রতা অর্জনে সচেষ্ট হয়, আল্লাহর নামের যিকির করে এবং নামাজ আদায় করে।” (আ’লা : ১৪-১৫)
৮.“জুমার দিনে যখন নামাযের জন্য ডাকা হয় তখন আল্লাহর জিকিরের জন্য দ্রুত হাজির হও। (জুমা : ০৯)
৯.“নামাজ শেষে আল্লাহর যমীনে ছড়িয়ে পড়ো। আল্লাহর ফযল অর্থাৎ হালাল রিযিক তালাশ করো এবং বেশী বেশী করে আল্লাহর যিকির করো। (জুমা : ১০)
১০.“অতঃপর তোমরা যখন নামায সম্পন্ন কর তখন দন্ডায়ামান, উপবিষ্ঠ ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর”। (নিসা : ১৪২)
১১.“অত:পর যখন তোমরা নামায আদায় করবে, তখন আল্লাহর যিকির করবে দাড়িঁয়ে বসে এবং শায়িত অবস্থায়ও।” (নিসা : ৩০১)
১২.“অত:পর আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ কর। এ পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে না। (আরাফ : ৭৪)
১৩.“তোমাদের কাছে আমরা যা নিয়ে এসেছি তা আকঁড়ে ধর শক্ত করে, আর এর মধ্যে যা কিছু আছে তা স্মরণ কর। যাতে করে তোমরা মুক্তি লাভ সক্ষম হও।” (আরাফ : ১৭১)
১৪.“তোমরা রবের যিকির কর মনে মনে, ব্যাকুল ও ভীতি সহকারে উচ্চ¯^রে নয়। এভাবে যিকির কর সকাল : সন্ধ্যায়। আর কখনোও এ ব্যাপারে উদাসীন হবে না। (আরাফ : ২০৫)
১৫.“যে ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে, সে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে গন্তব্যের প্রতি। এই সফর খুবই শ্রমসাধ্য এবং এখানে চিত্তবিক্ষেপের সম্ভাবনাও বড় বেশি। শয়তান এবং আমাদের প্রবৃত্তি অব্যাহতভাবে চেষ্টা করছে আমাদেরকে বিপথগামী করতে। কিন্তু যারা সতর্ক ও জ্ঞানী, তাদের দৃষ্টি কখনোই গন্তব্য ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয় না; এবং এরাই তারা, যাদের অন্তরে সর্বদা আল্লাহর কথা জাগরুক। ‘‘নিঃসন্দেহে, আসমানসমূহ ও যমীনের এই নিখুঁত সৃষ্টি এবং দিবারাত্রির আবর্তনের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য পর্যাপ্ত নিদর্শন রয়েছে। (আর এই জ্ঞানবান লোক হচ্ছে তারা) যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শায়িত অবস্থায় সর্বদা আল্লাহ পাককে স্মরণ করে।’’ (ইমরান : ১৯০-১৯১)
১৬.“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন কোনো বাহিনীর সাথে সংঘাতে লিপ্ত হবে, তখন তোমরা সুদৃঢ় থাকো এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো, যাতে করে তোমরা উদ্দেশ্যে কৃতকার্য হতে পারো।” (আনফাল : ৪৫) এ আয়াতে যুদ্ধ-জিহাদে সফল হওয়ার জন্যে দুটি হেদায়েত বর্ণনা করা হয়েছে। এক. দৃঢ়তা ও স্থিরতা অবলম্বন করা। দুই. আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা। এতে প্রমাণিত হয়, যিকিরের কার্যকারিতা অনেক বেশী। তাছাড়া বালা-মুসিবত যতো বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর স্মরণ সে সকল বালা-মুসিবতকে দূর করে দেয়।
১৭.“হে মানুষ, কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তুমি তোমার সৃষ্টিকর্তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছো; অতঃপর তুমি তাঁর সাক্ষাত লাভ করবে”। (ইনফিতার : ৬)
১৮.“আকাশ ও যমীনে (আল্লাহর কুদরতের) কত (অসংখ্য) নিদর্শন রয়েছে, যার উপর দিয়ে মানুষের গমনাগমন, কিন্তু এতদসত্তে¡ও তারা কোনোরূপ মনোযোগ দেয় না” (ইউসুফ : ১০৫)।
১৯.“সেই দিন পৃথিবি তাহার বৃত্তান্ত বর্ননা করবে।” (যিলযাল : ৪)
২০.“নামায কায়েম কর নিশ্চয়ই নামাজ ফাহেশা ও মুনকার থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে এবং নি:সন্দেহে আল্লাহ যিকির বড় কথা বা প্রধান বিষয়।” (আনকাবুত : ৪৫)
২১.“জেনে রাখো! আল্লাহ পাকের যিকির দ্বারা অন্তরসমূহ শান্তি লাভ করে।” (রাদ : ২৮) অর্থাৎ আল্লাহপাকের যিকির দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি ও স্থিরতা আসে। অন্তরের সব অস্থিরতা দূর হয়ে যায়।
২৪.“তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো। আমার শুকরিয়া আদায় করো, না শুকরী করোনা।” (বাকারাহ : ১৫২)
২২.“তোমরা রবের নামে যিকির করো এবং সবকিছু থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো।” (মুজ্জাম্মিল : ০৮)
২৩.“সকাল সন্ধ্যা তোমরা রবের স্মারণ কর”। (দাহার : ২৫)

যিকির সর্ম্পকে হাদীসের ভাষ্য

১. হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “আল্লাহতায়ালা বলেন; আমার সম্পর্কে আমার বান্দার ধারণা মোতাবেক। আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে আমাকে তার অন্তরে স্মরণ করে আমি তাকে আমার অন্তরে স্মরণ করি। যদি সে আমাকে মজলিশে স্মরণ করে আমি তাকে তাদের চেয়ে উত্তম মজলিসে স্মরণ করি। যদি সে আমার নিকট এক বিঘত অগ্রসর হয় আমি তার নিকট একহাত অগ্রসর হই, যদি সে আমার নিকট একহাত অগ্রসর হয় আমি তার নিকট একবাহু অগ্রসর হই। যদি সে আমার নিকট আসে হেটে আমি তার নিকট যাই দ্রুত। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, জামে আত তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
২. হযরত আবু হুরায়রা ও আবু সাঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন, তিনি বলেছেন, বান্দা যখন বলে : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার। তিনি বলেন : আল্লাহ বলেন : আমার বান্দা ঠিক বলেছে, আমি ছাড়া কোন হক ইলাহ নেই, আমি মহান। বান্দা যখন বলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু তিনি বলেন : আমরা বান্দা ঠিক বলেছে, একলা আমি ছাড়া কোন হক ইলাহ নেই। বান্দা যখন বলে : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লা শারিক্বালাহু তিনি বলেন : আমার বান্দা ঠিক বলেছে, আমি ছাড়া কোন হক ইলাহ নেই, রাজত্ব আমার, আমার জন্যই প্রশংসা। বান্দা যখন বলে : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া লাহা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতাবিল্লাহ, তিনি বলেন; আমার বান্দা ঠিক বলেছে, আমি ছাড়া কোন হক ইলাহ নেই, আমার তৌফিক ব্যতীত পাপ থেকে বিরত থাকা ও ইবাদত করার ক্ষমতা নেই। (ইবনে মাজাহ, জামে আত তিরমিযী, ইবনে হুমাইদ, ইবনে হিব্বান)
৩. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আমি কি তোমাদিগকে এমন একটা আমলের কথা বলবোনা যা সকল আমল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, তোমাদের মর্যাদাকে সবছেড়ে উচুকারী, সোনা ও রুপাদান করার চাইতেও শ্রেষ্ঠ এবং জিহাদে শক্রুদের সম্মুখীন হওয়া যে, তোমরা তাদেরকে মারবে আর তারা তোমাদের মারবে এভাবে জেহাদ করার চাইতেও উত্তম? তখন সাহাবাগন উত্তরে বললেন হ্যাঁ অবশ্যই বলুন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : তা হলো আল্লাহর যিকির । (মুসনাদে আহমদ, জামে আত তিরমিযি, ইবনে মাজাহ, ইবনে আবিদ, দুনিয়া, হাকেম, বায়হকী, জামে সগীর, মিশকাত শরীফ)
৪. হযরত মুআয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘কোনো বান্দা এমন কোনো আমল করতে পারে না যা তাকে যিকিরের চেড়ে অধিক আল্লাহর আযাব থেকে নাজাত দিবে।’ (ইবনে মাজাহ)
৫. হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে তিনবার আল্লাহর নিকট জান্নাত চায়, জান্নাত বলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল কর। আর যে তিনবার জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চায়, জাহান্নাম বলে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ কর। (জামে আত তিরমিযী)
৬. হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ফজরের নামায পড়ে সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকির করা অবস্থায় অপেক্ষা করে এবং পরে দুই রাকা’আত নামায পড়ে তার জন্য রয়েছে ১টি হজ্জ ১টি ওমরর পূর্ণ সওয়াব। (জামে আত তিরমিযী)
৭. হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ বলেছেন, আমার বান্দা যখন এক বিঘত এগিয়ে আমার সাথে সাক্ষাত করে আমি তার সাথে সাক্ষাত করি একহাত এগিয়ে। যখন সে একহাত এগিয়ে আমার সাথে সাক্ষাত করে আমি একবাহু এগিয়ে তার সাথে সাক্ষাত করি। যখন সে আমার সাথে । যখন সে আমার সাথে সাক্ষাত করে একবাহু এগিয়ে আমি তার নিকট আসি আরও দ্রুত পদক্ষেপ। (সহীহ মুসলিম)
৮. হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি প্রতিদিন একশতবার “সুবহানাল্লাহি ওয়া বেহামদিহি” পাঠ করবে তার জীবনের সমস্ত গোনাহ আল্লাহ পাক ক্ষমা করে দিবেন। এই গোনাহ সমুদ্রের পানির বরাবর হলেও! (সহীহ মুসলিম, ফোওয়ায়েদুল মুরিদিন)
৯. হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয নামাযের পর ৩৩বার সুবহাল্লাহ, ৩৩বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৩বার আল্লাহু আকবার পড়ে এবং একশতবার পূর্ণ করার জন্য একবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াদাহু লা-শারিকালাহু লাহুল মূলক ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদির পড়ে, তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়, যদিও তা হয় সাগরের ফেনাপুঞ্জের সমান। (সহীহ মুসলিম)
১০.হযরত আবদুল মালেক আশ’আরী রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : তাহারাত ঈমানের অর্ধেক আর “আলহামদুলিল্লাহ” বাক্যটি মীযান (দাঁড়িপাল্লা) ভরে দেয় এবং “সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ” এই বাক্য দু’টি ভরে দেয় বা এদের প্রত্যেকটি ভরে দেয় আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে সবটুক। (সহীহ মুসলিম)
১১.হযরত আবদুল মালেক আল হারেস ইবনে আসেম আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক; আলহামদুলিল্লাহ (সমস্ত প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য) বললে পাল্লা পরিপূর্ণ করে দেয় এবং “সুবহানাল্লাহ ওয়া হামদুলিল্লাহ” (আল্লাহ কতই না পবিত্র! এবং সমস্ত প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য) উভয়ে অথবা এর একটি আসমান ও যমীনের মাঝখান পূর্ণ করে দেয়। নামায হচ্ছে আলো, সাদকা হচ্ছে প্রমাণ, সবর হচ্ছে উজ্জ্বল আলো, আর কুরআন হচ্ছে তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে প্রমাণ। প্রত্যেক ব্যক্তি আত্মার ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে সকাল শুরু করে-আর তা হয় তাকে মুক্ত করে দেয় অথবা তাকে ধ্বংস করে দেয়।
১২.হযরত সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত। এক সময় আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ছিলাম। এ সময় তিনি বললেন : তোমাদের কেউ কি প্রতিদিন হাজারটি নেকী অর্জন করতে পারনা? উপস্থিত সাহাবাদের মধ্যে থেকে একজন আরয করলেন : কেমন করে সে হাজারটি নেকী অর্জন করবে? জবাব দিলেন : সে একশত বার “সুবহানাল্লাহ” পড়বে। এতে তার নামে একহাজারের নেকী লেখা হবে অথবা তার একহাজার গুনাহ মিটিয়ে দেয়া হবে। (সহীহ মুসলিম)
১৩.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনে : যে ব্যক্তি দিনে একশবার “সুবহানাল্লাহহি ওয়াবিহামদিহি” পড়ে তার ভুল-ক্রটি সমুদ্রের ফেনার সমান হলেও ক্ষমা করে দেয়া হয়। (সহীহ মুসলিম)
১৪.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম বলেছেন; প্রত্যেহ যখন সূর্য উঠে মানুষের (শরীরের) প্রত্যেক গ্রন্থির সাদকাহ দেয়া অবশ্য কর্তব্য। দুজন মানুষের মাঝে ইনসাফ করা হচ্ছে সাদকাহ, কোন আরোহীকে তার বাহনের উপর আরোহন করতে বা তার উপর বোঝা উঠাতে সাহায্য করা হচ্ছে সাদকাহ, ভাল কথা হচ্ছে সাদকাহ, সালাতের জন্য প্রত্যেক পদক্ষেপ হচ্ছে সাদকাহ এবং কষ্টদায়ক জিনিস রাস্তা থেকে সরানো হচ্ছে সাদকাহ। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম)
১৫.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কোনো একটি দল বা জামাত আল্লাহর যিকির করতে বসে, তখন ফেরেশতাগণ তাদেরকে বেষ্টনী করে রাখে, আল্লাহর রহমত তাদেরকে ঢেকে ফেলে এবং তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হয়। (সহীহ মুসলিম)
১৬.হযরত শুরাইহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, নবী সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; আল্লাহতায়ালা বলেন, হে বনি আদম, তুমি আমার দিকে দাঁড়াও আমি তোমার দিকে চলব, তুমি আমার দিকে চল আমি তোমার দিকে দ্রুত পদক্ষেপে যাব। (মুসনাদে আহমদ)
১৭.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আল্লাহতায়ালার একটি ফেরেস্তা দল আছে, যারা পথে পথে যিকিরকারীদের সন্ধান করে বেড়ায়। যখনই তারা মহামহিম আল্লাহর যিকিরত কোন লোকের সন্ধান পায়, সাথীদের ডেকে বলে : এদিকে এসো! তোমাদের প্রয়োজনের দিকে এসো! তখন তারা সবাই দৌড়ে এসে নিজেদের ডানা দিয়ে যিকরকারীদের পরিবেষ্টন করে। তাদের এই পরিবেষ্টনের ধারা উর্ধাকাশ পযর্ন্ত দীর্ঘায়িত হয়। তাদের রব তাদের কাছে জানতে চান যদিও তিনিই সর্বাধিক জ্ঞাত আমার দাসগুলো কি বলেছে ? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন তখন ফেরেস্তারা জবাব দেয় : তারা তোমার পবিত্রতা ও ক্রুটিহীনতা (তাসবিহ) প্রকাশ করছে, তোমর শ্রেষ্ঠত্ব (তাকবীল) ঘোষণা করছে, তোমার প্রশংসা (তাহমীদ) উচ্চারণ করছে এবং তোমার শ্রেষ্ঠতম মর্যদার (তামজীদ) কথা ঘোষণা করছে। তিনি জিজ্ঞেস করেন : ওরা কি আমাকে দেখেছে? ফেরেস্তারা জবাব দেয় ‘না’ আল্লাহর কসম, ওরা আপনাকে দেখেনি। আল্লাহ বলেন : ওরা যদি আমাকে দেখতে ফেতো তখন ওদের অবস্থা কেমন হতো ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন ফেরেস্তারা জবাব দেয় : আপনাকে দেখতে পেলে, তারা আপানার কঠোর ইবাদতে আতœনিয়োগ করতো। আপানার মর্যাদা প্রকাশে চরমভাবে লিপ্ত হতো। অত্যর্ধিকভাবে তাসবীহ উচ্চারণ করতো। তিনি জানতে চান : ওরা আমার কাছে কি চায় ? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : ফেরেস্তারা জবাব দেয় : তারা আপনার কাছে জান্নাত প্রার্থনা করেছে। তিনি জিজ্ঞেস করেন; ওরা কি জান্নাত দেখেছে ? ফেরেস্তারা জবাব দেয় : না, হে প্রভু আপনার শপথ! তারা জান্নাত দেখেনি। তিনি জেজ্ঞেস করেন, জান্নাত যদি ওরা দেখতে পেতো তবে ওদের অবস্থা কেমন হতো ? তারা জবাব দেন : জান্নাত দেখতে পেলে তারা তার জন্য আরো চরম লোভাতুর হতো, অতিমাত্রায় তলবগার হতো এবং পরম সম্মোহনে নির্মজিত হতো। তিনি জানতে চান : তারা কোন জিনিস থেকে আশ্রয় চাইছে ? ফেরেশতারা বলেন : তারা জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাইছে। তিনি জেজ্ঞেস করেন ওরা কি কখনো জাহান্নাম দেখেছে ? ফেরেস্তারা জবাব দেন না, হে প্রভু দেখেনি। তিনি জিজ্ঞেস করেন : তিনি জিজ্ঞেস করেন : দেখলে তাদের অবস্থা কি রকম হতে ? তারা জবাব দেয় : দেখলে তা থেকে তারা চরমভাবে পলায়ন করতে এবং সাংঘতিক ধরণের ভীত হয়ে কাঁদত। তখন আল্লাহ বলেন : আমি তোমাদের ¯^াক্ষী রেখে বলছি, আমি ওদের ক্ষমা করে দিলাম। তখন একজন ফেরেস্তা বলেন, এদের একজন লোক আছে, সে আসলে তাদের অর্ন্তভুক্ত নয়। সে অন্য কোনো কারনে এখানে এসেছে, আল্লাহ বলেন : এরা এমন মজলিসের লোক যে মজলিসের কাউকেও বঞ্চিত করা হয় না। (সহীহ আল বুখারী)
১৮.হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে যার যার সূরা কুলহু আল্লাহু আহাদ পড়তে শুনে সকাল হলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে তা বর্ণনা করলো। লোকটি যেন কুলহু আল্লাহু আহাদ এর মর্যাদাকে খাটো করছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তার কসম করে বলছি এ সূরাটি অবশ্যই কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান। (সহীহ আল বুখারী)
১৪.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “কুলহু ওয়াল্লাহু আহাদ” সর্ম্পকে বলেছেন : এ সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াশের সমান। (সহীহ মুসলিম)
১৯.হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত তিনি বলেছেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক ব্যক্তি একটি সেনাদলের অধিনায়ক করে যোদ্ধাভিযানে পাঠালেন। নামাযে সে যখন সঙ্গীদের ইমামতি করতো তখন কুলহু আল্লাহু আহাদ দিয়ে শেষ করতো। অভিযান শেষে ফিরে এসে লোকজন ঐ বিষয়টি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বললে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে কেন এরূপ করে তা জিজ্ঞেস করো। সবাই তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বললো, ঐ সূরাতে আল্লাহতায়ালার গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে তাই তা পাঠ করতে আমি ভালোবাসি। এ কথা শুনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন তাকে জানিয়ে দাও যে আল্লাহও তাকে ভালোবাসে। (সহীহ আল বুখারী)
২০.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনুহু থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আল্লাহতায়ালা বলেন : আমি আমার বান্দার সাথেই আছি যখন সে আমাকে স্মরণ করে ও তার দুই ঠোট নড়ে। (মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ)
২১.নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি খাঁটি অন্তরে কালেমা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ” পাঠ করবে সে বেহেশতবাসী হবে।
২২.হযরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : “যখন কোনো মুমিন বান্দা কালেমা শরীফ অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ” উচ্চারণ করেন, তখন তার মুখ থেকে গাঢ় থেকে সবুজ বর্ণের পাখি বেশে দু’জন ফেরেশতা বের হয়ে আসেন। এদের দুটি পাখা এতো বড় যে তা মাশরিক ও মাগরিব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যেতে সক্ষম। এই ফেরেশতা দু’জন উর্ধ্ব জগতে আরশের নীচে পৌঁছে যায়। তাঁদের মুখ থেকে মধু-মক্ষিকার আওয়াজের ন্যায় গুণ-গুণ আওয়াজ বের হতে থাকে। আরশে আজিমে বিদ্যমান ফেরেশতাগণ এই দুই আগন্তুক ফেরেশতাকে বলতে থাকেন, চুপ হও! আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের মহা-পরাক্রমের প্রতি লক্ষ্য করে আওয়াজ বন্ধ করো! তখন আগন্তুক দুই ফেরেশতা বলেন, আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত যে পর্যন্ত কালেমা শরীফ পাঠকারী বান্দার সমস্ত গুনাহ মাফ করে না দেন, সে পর্যন্ত আমরা চুপ হতে পারি না। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে নি:সন্দেহে আমি কালেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ পাঠকারীকে ক্ষমা করে দিলাম। অত:পর আল্লাহ জাল্লা শানহু উক্ত দুই ফেরেশতাকে সত্তর হাজার যবান দান করেন, যার দ্বারা তারা কেয়ামত পর্যন্ত কালেমা শরীফ পাঠকারী বান্দার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। কেয়ামত সংঘঠিত হওয়ার পর এই দুই ফেরেশতা কালেমাশরীফ পাঠকারী বান্দার নিকট হাজির হয়ে হাত ধরে তাকে পুলসিরাত পার করে দিবেন।
২৩.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” হল নিরানব্বইটি রোগের ওষধ যাদের সহজটা হল চিন্তা। (সুনানে বায়হাকী)
২৪.হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : বান্দা যখন বলে,“হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক!” আল্লাহ তখন বলেন, “হে আমার বান্দা! আমি উপস্থিত আছি। তুমি চাও, তুমি যা চাইবে তোমাকে তাই দেয়া হবে।” (ইবনে আবিদ-দুনইয়া, সুনানে বায়হাকী)
২৫.হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি “সুবহানাল্লাহি ওয়া বেহামদিহি” বলবে তার জন্য একটি খেজুর গাছ রোপন করা হয়। (জামে আত তিরমিযী, সুনানে নাসায়ী)
২৬.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম : এর চাচাতো বোন উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে আসলে আমি বললাম : হে আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে পড়েছি অথবা এ ধরনের অন্য কোন শব্দ তিনি ব্যবহার করেছিলেন : আপনি এমন কোন আমল আমাকে বলে দিন যা আমি বসে বসে করবো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : এক’শবার ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়। এটা তোমার জন্য ইসমাঈলের বংশের একশ’ ক্রীতদাস মুক্ত করার সওয়াবের সমান হবে। এক’শবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়। এটা তোমার জন্য আল্লাহর রাস্তায় একশ’ ঘোড়া সজ্জিত করে দেয়ার সওয়াবের সমান হবে। একশ’বার ‘আল্লাহু আকবার’ পড়। এটা তোমার জন্য আল্লাহর দরবারে গৃহীত এবং কিলাদা বাঁধা একশ’উটের সওয়ারেব সমান হবে। একশ’বার ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ পড়। এটা তোমার জন্য আসমান ও জমীনের মধ্যবর্তী সবকিছুকে পূর্ণ করে দেবে।
২৭.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : এমন দু’টি দোয়া আছে যার উচ্চারণ খুবই সহজ। কিন্তু (কিয়ামতের দিন) মিজানে অত্যন্ত ভারী ও ওজনদার এবং রাহমানের কাছে অতীব প্রিয়। দোয়া দু’টি হচ্ছে : “সুবহানাল্লাহি ওয়া বেহামদিহি ওয়া সুবহানাল্লাহিল আযিম”।
২৮.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি প্রতিদিন একশতবার বলবে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াদাহু লা-শারিকালাহু লাহুল মূলক ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির” (অর্থাৎ আল্লাহ ছড়া আর কোন ইলাহ নেই । তিনি এক তার কোন শরীক নেই। সমস্ত রাজত্ব তাঁর। তিনি সকল বস্তুর উপর শক্তিশালী)
১। সে দশটি গোলাম আযাদ করার সওয়াব লাভ করবে।
২। তার নামে একশোটি নেকী লিখা হবে।
৩। তার নাম থেকে দশটি গুনাহ মুছে ফেলা হবে।
৪। সন্ধা পর্যন্ত শয়তান থেকে হেফজতে থাকবে।
২৯.হযরত আবি মাকনা ইমাম ইয়ালার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদা তিনি আরজ করেছিলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ সল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম লোকেরা সাদকাহ করে পূণ্য অর্জন করে থাকে কিন্তু আমর নিকট সাদকা দেওয়ার মতো কিছু নাই। তবে আমিত “সবুহানাল্লাহ, ওয়াল হামদুলিল্লাহ, ওয়া লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়ালা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম” পড়ে থাকি। একথা শুনে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছিলেন “এই বাক্যগুলো নিয়মিত পাঠ করা মিছকিনদের মধ্যে এক মন ¯^র্ণ সাদকাহ করার চাইতেও উত্তম।
৩০.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। এক দরিদ্র মুহাযির রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন : ধনবানরা তো সমস্ত বড় মর্যাদাগুলো দখল করে নিলেন এবং চিরন্তন নিয়ামতগুলো তাদের ভাগে পড়লো। কারণ আমরা যে সব নামাজ পড়ি তারাও তেমনি নামাজ পড়ে, আমরা যে সব রোযা রাখি তারও তেমনি রোযা রাখে কিন্তু বিত্তের দিক দিয়ে তারা আমাদের চাইতে অগ্রসর। ফলে তারা হজ্জ করে, ওমরা করে, আবার জিহাদ করে এবং সাদকাও করে। জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : আমি কি তোমাদেরকে এমন জিনিস বলে দেবো (যার ওপর আমল করো) তোমরা নিজেদের চাইতে এগিয়ে যাবে আর তোমাদের মতো ঐ আমলগুলো না করা পর্যন্ত কেউ তোমাদের চাইতে অগ্রবর্তী হবে না ? তারা বললেন : হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই বলে দিন। তিনি বললেন : তোমরা প্রত্যেক নামাযের পর ৩৩বার তাসবীহ তামিহদ ও তাকবীর পড়ো। বর্ণনা কারী আবু সালেহ হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, যখন তাঁকে ঐ কালেমাগুলো পড়ার ধরণ সর্ম্পকে জিজ্ঞেস করা হলো তিনি বললেন : এ কালেমাগুলো সর্ম্পকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : এগুলো হচ্ছে ‘সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদুলিল্লাহ, ওয়াল্লাহু আকবার এবং প্রত্যেকটি কালেমাই হবে ৩৩বার।
৩১.হযরত আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহর কিছু সাহাবী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন; হে আল্লাহর রাসূল! বিত্তবান লোকেরা প্রতিফল ও সওয়াবের কাজে এগিয়ে গেছে। আমরা নামায পড়ি তারাও সেরকম নামায পড়ে, আমরা রোযা রাখি তারও সেরকম রোযা রাখে, তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ সাদকাহ করে। তিনি বলেন; আল্লাহ কি তোমাদের জন্য এমন জিনিসি রাখেননি যে তোমরা সাদকাহ দিতে পারো। প্রত্যেক তাসবী (সুবহান আল্লাহ) হচ্ছে সাদকাহ, প্রত্যেক তাকীবর (আল্লাহু আকবার) হচ্ছে সাদকাহ, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) হচ্ছে সাদকাহ প্রত্যেক তাহলীল (লা ইলা ইল্লাল্লাহু) হচ্ছে সাদকাহ, প্রত্যোক ভালো কাজের হুকুম দেয়া হচ্ছে সাদকাহ এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত করা হচ্ছে সাদকাহ। আর তোমাদের প্রত্যেকে আপনার স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও হচ্ছে সাদকাহ। তারা জিজ্ঞাসা করেন; হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে কেউ যখন যৌন আকাক্সখা সহকারে স্ত্রীর সাথে সম্ভোগ করে, তাতেও কি সওয়াব হবে? তিনি বলেন; তোমরা কি দেখ না, যখন সে হারাম পদ্ধতিতে তা করে, তখন সে গুনাহগার হয় কি না! সুতরাং অনুরূপভাবে যখন সে ঐ কাজ বৈধভাবে করে তখন সে তার জন্য প্রতিফল ও সওয়াব পাবে।
৩২. হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এ ঘটনার উল্লেখ আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মসজিদে নববীতে সাদকাহয়ে ফিতর হিসেবে জমাকৃত খাদ্যশস্যের তত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেছিলেন। এই সময়ে এক ব্যক্তি পর পর দুই রাত সেখানে খাদ্যশস্যের স্তুুপের কাছে এসে মুঠি ভরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকলো। প্রতিবারই হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে হাতেনাতে পাকড়াও করলেন। কিন্তু নিজের চরম দরিদ্রদশার কথা বলে এবং পুনারাবৃত্তি না করার প্রতিশ্রæতি দিয়ে সে মুক্তিলাভ করলো। তৃতীয় রাতে সে আবার আসলো। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে পাকড়াও করে বললেন : এবার আমি তোমাকে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হাজির না করে ছাড়ছি না। সে অনুনয় করে বললো, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে এমন কথা শিখিয়ে দিচ্ছি, যা তোমার জন্য খুবই কল্যাণকর হবে। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কল্যাণকর কথার অনুরক্ত ছিলেন। তাই তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। সে বললো, রাতে যখন তুমি বিছানায় যাবে তখন আয়াতুল কুরসী পড়বে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য একজন পাহারাদার নিযুক্ত করে দেয়া হবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু সকালে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ঘটনা শুনালে তিনি বললেন : সে নিজে মিথ্যাবাদী, কিন্তু তার এ কথাটা সত্য। তোমার সাথে যার কথা হয়েছে সে কে তা কি জানো? সে শয়তান। (সহীহ আল বুখারী)
“আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম, লা তা’খযুহু সিনাতুঁ ওয়ালা নাউমু, লাহু-মা ফিস সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্বি, মানযাল্লাযী ইয়াস ফা’উ ইনদাহু ইল্লা বি‘ইযনিহি, ইয়া‘লামু মা বাইনা আইদীহিম ওয়ামা খালাফাহুম, ওয়ালা ইউহীতূনা বিশাইইম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শা’-আ। ওয়াসিয়া কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা, ওয়ালা ইয়া’উদুহু হিফযুহুমা ওয়া হুওয়াল ‘আলীয়্যুল ‘আযীম”।
ক্স যে ব্যক্তি প্রভাতে ও শয়নকালে আয়তুল করছি পাঠ করবে, আল্লাহ পাক ¯^য়ং দিবারাত্রির জন্য তার রক্ষক হবেন।
ক্স আয়তুল কুরছি পাঠে জ্বীন, দেত্ত, ভুত ও শয়তানের আছর হতে রক্ষা পাওয়া যায়।
ক্স আয়তুল কুরছি পাঠের আমলে সকল প্রকার বিপদ আপদ ও দুংখ কষ্ট, দুর হয়। মনের বাসনা পূর্ণ হয়, রুজি রোজগার বৃদ্ধি পায়।
ক্স কোন কাজে রওয়ানার সময় বা বিদেশে যাওয়ার সময় তা পাঠ করে রওয়ানা দিলে নিরাপদে পৌঁছা যায় এবং সফরের উদ্দেশ্যে সফল হয়।
ক্স প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর আয়তুল কুরছি পাঠ করলে রূহ আরামের সাথে কবজ হয় এবং সহজে বেহশতে প্রবেশ করা সম্ভব হবে।
৩৩.সূরা হাশরের শেষাংশ প্রত্যেহ সকালে পাঠ করলে ৭০ হাজার ফেরেশতা সন্ধা পর্যন্ত ও সন্ধায় পাঠ করলে সকাল পর্যন্ত পাঠ কারীর মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেন ও তার রক্ষনা বেক্ষন করেন। ফলে সকল প্রকার ফায়দা হাসিল হয়। যদি এ সময়ের মধ্যে সে মারা যায়, তবে শহীদি মর্তবা পাবে। এটি একটি উৎকৃষ্ট আমল। তিন বার আউযু বিল্লাহিচ্ছামিউল আলিম হিমিনাশ শায়তানির রাজীম ও একবার বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পাঠ করে উক্ত আয়াতটি পড়তে হয়ে।
“হুওয়াল্লা হুললাযী লা-ইলাহা ইল্লাহু আ’-লিমুল গাইবি ওয়াশশাহাদাতি হুওয়ার রাহমানুর রাহীম।
হুওয়াল্লা হুললাযী লা-ইলাহা ইল্লাহু আলমালিকুল কুদ্দুসুস সালামুল মু‘মিনুল মুহাইমিনুল আযীযুল জ্বাব্বারুল মুতাক্বাব্বিরু; সুবহানাল্লাহি-আম্মা ইউশরিকুন।
হুয়াল্লা হুল খা-লিকুল বা-রিউল মুসাব্বিরু লাহুল আসমা-উল হুছনা; ইয়্যুসাব্বিহু লাহূ মা-ফিস্সামা ওয়াতি ওয়াল আরদ্বি, ওয়া হুওয়াল আযীযুল হাকীম”।
৩৪.আবু মাসউদ আনসারী বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ঘুমানোর সময় যে ব্যক্তি সূরা বাকারার শেষ তিনটি আয়াত তিলাওয়াত করবে সেটি তার জন্য সব ব্যাপারেই যথেষ্ট হবে। কেউ কেউ এর অর্থ বুঝাচ্ছেন এই যে, এ আয়াতগুলির তিলাওয়াত করলে রাত জেসে ইবাদতের জন্যও যথেষ্ট হবে। কিন্তু এ অর্থটি একেবারেই ঠিক নয়। এ যথেষ্ট হওয়ার সঠিক অর্থ হলো, তা মানুষকে সব রকমের অকল্যাণ ও বিপদ থেকে নিরাপদ রাখবে। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিমে)
৩৫.হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : আমি মনে করি না, সূরা বাকারার শেষ তিনটি আয়াত না পড়ে কোন জ্ঞানী ব্যক্তি ঘুমাতে পারে।
৩৬.হযরত আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন : আমি কি তোমাকে জান্নাতের কোনো গুপ্ত ধনের কথা জানাবো না ? আমি বললাম : অবশ্যি জানান, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন : (সে গুপ্তঘনটি হচ্ছে) লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ ।
৩৭.নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে কোন বান্দা সব চেড়ে শ্রেষ্ট ও উচু মর্যাদার আধিকারী হবে ? জবাবে রাসূলে পাক বললেন আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণকারী নারী ও পুরুষ গন। তখন আবার প্রশ্ন করা হলো আল্লাহর রাস্তায় জেহাদকারী অপেক্ষাও কি? জবাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ সে যদি তার তরবারী দ্বারা কাফের ও মুশরেকদেরকে এমন ভাবে কাটে যে, তার তরবারী ভেঙ্গে যায় আর সে নিজে রক্তে রক্তাক্ত হয়ে যায়। তবওু তার চেয়ে আল্লাহর যিকিরকারী মর্যাদার দিক দিয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ। (মুসনাদে আহমদ, জামে আত তিরমিযী, সুনানে বায়হকী, মিশকত)।
৩৮.নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন : মানুষ যখন কোন খারাপ কাজ বা গুনাহ করে তখন তার ক্বলবের মধ্যে কালো দাগ পড়ে যায়। তওবা ও এস্তেগফার করে নেয় তাহলে তার ক্বলব ছাফ হয়ে যায় আর যদি গুনাহ বাড়তে থাকে তাহলে দাগও বাড়তে থাকে ও অবশেষে এটা ক্বলবকে ঘিরে ফেলে”। (জামে আত তিরমিযী)
৩৯.নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন : নিশ্চয়ই ক্বলব সমুহে মরিচা পড়ে। যেমন ভাবে লোহার মধ্যে পানি লাগলে মরিচা পড়ে। তখন সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা পরিস্কার করার উপায় কি? জবাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন মৃত্যুকে খুব বেশী বেশী স্মরণ করা আর কোরান তেলওয়াত করা”।
৪০.হযরত মায়াজ ইবনে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে জনৈক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন মুজাহিদ গণের মাঝে সর্বাধিক প্রতিদান ও সওয়াবের অধিকারী কোন ব্যক্তি হবে ? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : ‘‘যে সব চেড়ে বেশী আল্লাহকে ম্মরণ করে অথার্ৎ যিকির করে। অতপর জিজ্ঞাসা করা হলো রোজাদারগণের মধ্যে সর্বোচ্চ সওয়াবের অধিকারী কে হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন যে রোজাদার আল্লাহর যিকির সবচেড়ে বেশী করবে। এরুপ ভাবে নামাজ, যাকাত, হজ্ব, সদকা প্রভৃতি সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করলো। তিনি প্রতিবার একই উত্তর দিলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির সব চেড়ে বেশী করবে সেই সর্বোচ্চ প্রতিদান লাভ করবে।’’
৪১.হযরত সাবেত বুনানী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : ‘‘আল্লাহ পাক কখন আমাকে ¯^রণ করেন তা আমি জানি।’’লোকেরা আশ্চর্যাšি^ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন : ‘‘আমি যখন আল্লাহকে স্মরণ করি ঠিক তখনই তিনি আমাকে স্মরণ করেন।’’
৪২.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : ‘‘আল্লাহপাক যিকির ব্যতিত কোন ফরযই আরোপ করেননি যার পরিসীমা বা পরিধি নির্ধারিত নেই, নামাজ দিনে পাঁচবার রমজানের রোজা নিদৃষ্ট সময়ের জন্যে, যাকাতও বৎসরে একবার দিলেই হয়, হজ্জ্ব জীবনে একবার পালন করলে হয় কিন্তু আল্লাহর যিকির বা স¤œরণ এমন একটা এবাদত যার কোন সীমা সংখ্যা নির্ধারিত নেই, বিশেষ কোন সময়কালও নির্ধারিত নেই অথবা এর জন্য বসা বা শায়িত অবস্থায় থাকারও কোন কথা নেই। এমন কি অজু ও পবিত্র অবস্থায় থাকারও কোন শর্ত নেই। সফরে থাকুক বা বাড়িতে থাকুক, সুস্থ থাকুক বা অসুস্থ থাকুক, জলভাগ কিংবা স্থলভাগ, রাত হোক বা দিন সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণের হুকুম রয়েছে। এজন্য যিকির বা আল্লাহর স্মরণ বর্জনকারীর কোন কৈফিয়ত গ্রহন যোগ্য হবে না। যদি না সে অনুভূতি বিহিন ও বেহুশ হয়ে পড়ে।’’
৪৩.হযরত মুয়াজ ইবনে যাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : ‘‘বেহেশতীরা বেহেস্তে অবস্থান কালে কোন বিষয়ই আফসোস করবেনা, শুধুমাত্র পৃথিবীতে অবস্থান কালে যে সময়টুকু আল্লাহর যিকির করে নাই সে সময় টুকুর জন্যই আফসোস করবে।’’
৪৪.রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : ‘‘যে ব্যক্তি জান্নাতের বাগিচায় পায়চারী করতে চায়, সে যেন অধিক পরিমানে আল্লাহর স্মরণ করে।
৪৫.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : ‘‘দুনিয়ার যে ঘর গুলোতে আল্লাহর যিকির হতে থাকে সে ঘর গুলো উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় চমকাতে থাকে। ফেরেস্তারা আসমান থেকে তা অবলোকন করতে থাকেন।’’
৪৬.নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : ‘‘কোন মানব দল কোথাও বসে আল্লাহর যিকির করলে ফেরেস্তারা তাদের ঘিরে নেয় এবং তাদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়।’’
৪৭.হযরত আবু মূসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ¯^ীয় প্রভুর যিকির করে এবং যে যিকির করে না, তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের মতো। (সহীহ আল বুখারি) অর্থাৎ, যিকিরের দ্বারা অন্তর জীবিত হয়, আর যিকির থেকে উদাসীন হওয়ার কারণে অন্তর মৃতের মতো হয়ে যায়।
৪৮.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বুসর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ইসলামের বিধি-বিধান (নফল) আমার ওপর অনেক। আমাকে সংক্ষিপ্ত কিছু বলে দিন যা আমি সর্বদা ধরে থাকতে পারি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তোমার জিহŸা যেন সর্বদা আল্লাহর যিকিরে তরতাজা থাকে। (জামে আত তিরমিযী)
৪৯.হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে বান্দাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ ও অধিক মর্যাদাবান হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর অধিক যিকিরকারী পুরুষ ও নারী। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর চেয়েও কী অধিক মর্যাদাবান হবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, এমনকি সে যদি নিজের তলোয়ার দ্বারা কাফের ও মুশরিকদেরকে হত্যা করতে করতে তার তলোয়ারও ভেঙে যায়, আর সে নিজেও রক্তাক্ত হয়, তা থেকেও আল্লাহর যিকিরকারী শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান।’ (জামে আত তিরমিযী)
৫০.হযরত সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন ‘যারা সোনা- রূপা জমা করে’ (শেষ পর্যন্ত) আয়াতটি অবতীর্ণ হলো, তখন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক সফরে ছিলাম, একজন সাহাবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, সোনা- রূপার ব্যাপারে আয়াতটি অবতীর্ণ হলো, আমরা যদি জানতে পারতাম কোন সম্পদ উত্তম। তবে তা আমরা জমা করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো, আল্লাহর যিকিরকারী রসনা, কৃতজ্ঞ অন্তর এবং ঈমানদার স্ত্রী যে ঈমানের ব্যাপারে সাহায্য করে।’ (জামে আত তিরমিযী)
৫১.হযরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘আল্লাহর যিকির ব্যতীত বেশী কথা বলিও না। কেননা, আল্লাহর যিকির ব্যতীত বেশি কথা অন্তরকে নিষ্ঠুর করে দেয়, আর নিষ্ঠুর অন্তর ব্যক্তিই আল্লাহ থেকে সর্বাপেক্ষা দূরে।’ (জামে আত তিরমিযী)
৫২.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, প্রত্যেক জিনিসেরই একটি রেত রয়েছে, অন্তরের রেত হলো, আল্লাহর যিকির। (মেশকাত) অর্থাৎ গুনাহের কারণে মানুষের অন্তরে মরিচা লাগে, গুনাহ যতো বেশি মরিচাও ততো বেশি লাগে। এই মরিচা দূরীভূত করার পন্থা হলো, আল্লাহর যিকির। অন্য এক হাদীসে এসেছে, শয়তান আদম সন্তানের অন্তরে আধিপত্য বিস্তার করে থাকে। কিন্তু মানুষ যখন আল্লাহকে স্মরণ করে তখন সে সরে যায়, কিন্তু মানুষ যখন যিকির থেকে উদাসীন হয়, তখন শয়তান কু-মন্ত্রনা দেয়।
৫৩.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে এমন এক দোয়া শিক্ষা লাভ করেছি, যা কখনো ছেড়ে দেয়নি। তা হচ্ছে, ‘হে আল্লাহ! আমাকে অধিক পরিমাণে তোমার কৃতজ্ঞতা আদায়ের, তোমার উপদেশের অনুসারী হওয়ার, অধিক পরিমাণে তোমার যিকির করার এবং তোমার ওসিয়ত সংরক্ষণের তাওফিক দাও।’ (ইবনে কাসির) এতে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহপাকের কাছে অধিক পরিমাণে তাঁর যিকিরের তাওফিক প্রদানের জন্যে দোয়া করতেন।
৫৪.হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : সুমহান আল্লাহ বলবেন, “যে লোক কোন একদিন আমাকে স্মরণ করেছে বা কোন এক স্থানে আমাকে ভয় করেছে, তাকে দোযখের অগ্নি থেকে বের কর।” (জামে আত তিরমিযী)
৫৫.হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : সুমহান আল্লাহ্ বলেছেন, “আমার বান্দা যখন আমাকে নিভৃতে ¯^রণ করে, আমিও তাকে নিভৃতে স্মরণ করি। আর সে যখন আমাকে কোন মজলিসের মধ্যে স্মরণ করে, আমিও তাকে এমন এক মজলিশের মধ্যে স্মরণ করি, যা তার সেই মজলিশের চেয়েও উত্তম-যাতে সে আমাকে স্মরণ করেছিল।” (তিবরানী)
৫৬.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মহান আল্লাহ বলেন,“হে আদম সন্তান! ফজর ও আসর নামাযের পরে কিছু সময়ের জন্য আমাকে স্মরণ কর। তা হলে উভয় নামাযের মধ্য সময়ে আমি তোমাকে সহায়তা করব।”
৫৭.হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মূসা (আঃ) বললেন, “হে আমার রব। আমি চাই, তোমার বান্দাদের মধ্যে তুমি যাকে ভালবাস আমিও যেন তাকে ভালবাসতে পারি।” আল্লাহ্ বললেন, “(হে মূসা), তুমি যখন দেখ, আমার কোন বান্দা বেশি আমার যিকির করছে (তখন বুঝে নিও) আমি তাকে এর সমতা দিয়েছি, আমার অনুমতিক্রমেই সে আমার যিকির করছে এবং তাকে আমি ভালবাসি। আর যখন দেখ, আমার কোন বান্দা আমার যিকির করে না তখন যেন আমি তাকে এ (আল্লাহর যিকির) থেকে বিরত রেখেছি এবং আমি তার উপর রুষ্ট।” (দারু কুতনী)
৫৮.হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মহান ও মর্যাদাশীল আল্লাহ্ বলেছেন, “রাগাম্বিত হওয়ার সময়ে যে আমাকে স্মরণ করে, আমিও রাগাম্বিত সময়ে তাকে স্মরণ করব এবং যাদেরকে আমি ধ্বংস করব, তাকে তাদের মধ্যে শামিল করব না।“ (দায়লামী)
৫৯.হযরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মহান আল্লাহ বলেন, “আমার যিকির যাকে এরূপভাবে নিমগ্ন রাখে যে, সে আমার কাছে কিছু চাওয়ার সময় পায় না, তাকে আমি এমন বস্তু দান করব, যা প্রার্থনাকারীদের প্রাপ্য বস্তুর চেয়েও উত্তম।” (ইমাম বুঝারী)
৬০.হযরত আবূ নুয়াঈ’ম হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মহান আল্লাহ বলেছেন, “যাকে আমার যিকির এভাবে মগ্ন রাখে যে, সে আমার কাছে তার কাম্যবস্তু চাওয়ারও অবসর পায় না, সে আমার কাছে চাওয়ার আগেই আমি তাকে দিয়ে দেই।”
৬১.হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : সেই পবিত্র সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন। নিশ্চয়ই মহান ও প্রতাপশালী আল্লাহ বেহেশতের কোন কোন গাছকে প্রত্যাদেশ করবেন, “আমার যে সকল বান্দা আমার যিকিরের জন্য গান-বাজনা থেকে নিবৃত রয়েছে তাদেরকে তুমি সুমিষ্ট সূর পরিবেশন কর।” তারা তখন তাসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনার বিনিময়ে (অর্থাৎ যিকিরের পুরস্কার হিসাবে) এরূপ সুমিষ্ট সূর শুনতে পাবে ইতিপূর্বে যার অনুরূপ সূর কোন সৃষ্টি জীব শুনেনি।” (দায়লামী)
৬২.আল্লাহর স্মরণ অথবা ‘যিকির’ মুসলমানদের জন্য শক্তির একটি উৎস। ‘হাদীসে কুদ্সী’তে আল্লাহ পাক বলেন, ‘আমি আমার বান্দার সঙ্গে ততক্ষণ থাকি যতক্ষণ সে আমাকে স্মরণ করে’। (সহীহ আল বুখারী) এটা এইজন্য যে, অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদত-বন্দেগী এবং যিকির-এর মধ্যে একটা পার্থক্য বিদ্যমান। অতিমাত্রায় আনুষ্ঠানিক ইবাদতের তেমন আবশ্যকতা নেই; এক্ষেত্রে কারো ইবাদত মাত্রাতিরিক্ত হয়ে না ওঠে সে বিষয়ে বরং সতর্কই করা হয়েছে। কিন্তু যিকির যেন বেশী-বেশী করা হয়, এই বিষয়টির প্রতি এমনভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যাতে আমাদের অন্তর ও জিহবা সত্যই আল্লাহর স্মরণে নিয়োজিত থাকে। আমরা যেন কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল ও উদাসীন হয়ে না পড়ি। আর এই কাজে আমরা ক্লান্ত হতে পারি না, হওয়া উচিতও নয়।
৬৩.মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘জান্নাতবাসীদের মনে কোনো-কারণেই কোনো দুঃখ থাকবে না; দুঃখ শুধু একটা কারণেই হবে, তা হল পার্থিব জীবনের যে, মুহূর্তগুলো তারা মহামহিমাšি^ত আল্লাহ পাকের স্মরণ থেকে উদাসীন ছিল।’ (তিবরানী)
আল্লাহ যাকে যিকির করতে নিষেধ করেছেন
১. হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আল্লাহ্ দাউদ (আঃ)-এর প্রতি প্রত্যাদেশ করলেন, “জালিমদেরকে বলে দাও, তারা যেন আমাকে স্মরণ না করে। কারণ যে লোক আমায় স্মরণ করে, আমিও তাকে স্মরণ করি। আর জালিমদেরকে স্মরণ করার অর্থ হল তাদের প্রতি আমার অভিশাপ বর্ষণ করা।” (হাকেম)
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মহান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ্ বলেছেন, “আনুগত্যের সাথে তোমরা আমাকে স্মরণ কর, তোমাদেরকে আমি ক্ষমা সহকারে স্মরণ করব। আমাকে যে স্মরণ করে সাথে সাথে সে যদি আমার অনুগত হয়, তবে আমার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে, আমি যেন তাকে ক্ষমার সাথে স্মরণ করি। আর যে আমাকে স্মরণ করে-অথচ সে আমার অবাধ্যচারী, তবে আমার জন্য কর্তব্য হয়ে পড়ে, আমি যেন তাকে ঘৃণার সাথে স্মরণ করি।” (দায়লামী)
যিকিরের সুফল ও উপকারিতা
যিকির করলে কি লাভ, যিকিরের সুফল ও উপকারিতাসমূহ কোরআন ও হাদীসের ভাষ্য অনুসারে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো-
১. যিকির অন্তর বা দিলের মরিচা দূর করে দেয়।
২. যিকির দিলকে জিন্দা করে।
৩.যিকিরকারীদের জন্য রয়েছে আল্লাহ মাগফিরাত ও প্রতিদান।
৪. যিকিরকারীদের প্রতি আল্লাহ অজ¯্র রহমত ও দয়া বর্ষণ করে।
৫. যিকির সকল বালা-মুসিবাত দুর করে।
৬. যিকির দ্বারা অন্তরসমূহ শান্তি লাভ করে।
৭. যিকির আল্লাহর আযাব থেকে নাযাত দেন।
৮. যিকিরের মাধ্যমে নেকী অর্জন করা যায়।
৯. যিকিরকারীদেকে আল্লাহর রহমত দিয়ে ফেরেশতাগন ঢেকে ফেলেন।
১০. যিকিরকারীদের জন্য ফেরেশতারা মাগফেরাতের দোয়া করেন।
১২. যিকির মুসলমানদের জন্য শক্তির উৎস।
১৩. যিকির শয়তানকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তার শক্তি নষ্ট করে দেয়।
১৪. যিকিরে মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়।
১৫. যিকির দুশ্চিন্তা দূর করে।
১৬. যিকির প্রশান্তি দান করে।
১৭. যিকির অন্তর ও শরীরে শক্তি যোগায়।
১৮. যিকির চেহারা ও অন্তরকে নূরানী করে।
১৯. যিকির রিযিকে বরকত আনে।
২০. যিকিরে গুনাহ মাফ হয়।
২১. আল্লাহর মহববত পয়দা করে।
২২. আল্লাহর নিকট ঐ মুত্তাকি বান্দা বেশী সম্মানিত যার যবান আল্লাহর যিকিরে তরতাজা থাকে। যে আল্লাহর ভয়ে তার আদেশ নিষেধ মেনে চলে এবং সর্বদা আল্লাহর যিকির করে। তাকওয়া ও পরহেযগারের কারণে আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। এবং জাহান্নাম থেকে নাযাত দিবেন । এটা হল তার কর্মের প্রতিদান। আর যিকিরের কারণে সে লাভ করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য। এটা হল তার বিশেষ মর্যাদা।
২৩. যিকিরে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়। যিকির যত বেশী হবে নৈকট্যও তত বৃদ্ধি পাবে। আর যিকির থেকে যতই গাফলতি করা হবে ততই আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাবে।
২৪. যিকির মানুষকে আল্লাহমূখী করে। ঘরে বাইরে তার হালত এমন হয় যে, সকল বিষয়ে আল্লাহতায়ালাকেই সাহায্যকারী মনে করে এবং যাবতীয় বিপদ আপদে তাঁরই অশ্রয় গ্রহণ করে।
২৫. যিকির অন্তরে আল্লাহর ভয় ও বড়ত্ব সৃষ্টি হয় এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাকে দেখছেন, এই অনুভূতি সৃষ্টি হয়।
২৬. ¯^য়ং আল্লাহ যিকিরকারীকে স্মরণ করেন।
২৭.যিকির হল দিল ও রূহের গিযা। খাদ্যের অভাবে শরীর যেমন দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি যিকিরের অভাবে দিলও মৃতপ্রায় হয়ে যায়।
২৮.যিকির আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করে এবং সম্পর্কহীনতা দূর করে। গাফিল আল্লাহ থেকে দূরে থাকে, শুধু যিকিরের মাধ্যমেই এই দূরত্ব দূর হয়।
২৯.যে ব্যক্তি সুখ ও সচ্ছলতায় আল্লাহকে স্মরণ করে, দু:খ ও মুছিবতে আল্লাহ তাকে স্মরণ করেন।
৩০. যিকিরের কারণে ছাকিনা ও রহমত নাযিল হয়। ফেরেশতারা চতুর্দিক থেকে যিকিরকারীকে ঘিরে রাখে।
৩১. যিকিরের বরকতে গীবত, চোগলখুরী, মিথ্যাকথা, বেহুদা কথা ইত্যাদি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যিকিরে অভ্যস্ত ব্যক্তি এই সব কাজ কর্মে লিপ্ত হয় না। পক্ষান্তরে যিকিরের বিষয়ে উদাসীন লোকেরা এই সব কর্মে লিপ্ত থাকে।
৩২. যিকিরের মযলিস ফেরেশতাদের মজলিস। আর গাফলতি ও বেহুদা কথাবার্তার মজলিস হল শয়তানের মজলিস।
৩৩. যিকিরের কারণে যেমন যিকিরকারী উপকৃত হয় তেমনি আশে পাশের লোকেরাও উপকৃত হয়। আর বেহুদা কথাবার্তায় লিপ্ত ব্যক্তি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তার আশে পাশের লোকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩৪. যিকিরকারী কেয়ামতের দিন আফসোস করবে না। হাদীসে আছে, যে মজলিসে আল্লাহর যিকির হয় না। কেয়ামতের দিন তা আফসোস ও ক্ষতির কারণ হবে।
৩৫. নির্জনে আল্লাহর স্মরণে যার চোখ থেকে অশ্রæঝরে সে কেয়ামতের দিন আরশের শীতল ছায়ায় স্থান পাবে। যখন মানুষ প্রচন্ড গরমে ছটফট করতে থাকবে।
৩৬. দোয়াকারী দোয়ার মাধ্যমে যা কিছু পায় যিকিরকারী যিকিরের কারণে তার চেড়ে অনেক বেশী পায়।
৩৭. যিকির যদিও সহজ ইবাদত।
৩৮. আল্লাহর যিকির জান্নাতের চারাগাছ।
৩৯. যিকিরে মাধ্যমে যে সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করে আল্লাহ তাকে রহমতের সাথে স্মরণ করেন। আর যে আল্লাহকে ভুলে যায় আল্লাহও তাকে ভুলে যান। আল্লাহ যাকে ভুলে যান দুনিয়া ও আখেরাতে তার চেড়ে দুর্ভাগা আর কে হতে পারে? সুতরাং যিকির হল সৌভাগ্য লাভ করার ও দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়।
৪০. যিকির মানুষকে সর্বাবস্থায় আল্লাহর রেযামন্দির পথে ধাবমান রাখে। বিছানায়, বিশ্রামে, সুস্থতায়, অসুস্থতায়, দুনিয়ার কাজকর্মে সর্বাবস্থায় যিকিরের মাধ্যমে উন্নতির পথে চলমান থাকা সম্ভব। যিকির ছাড়া আর কোন আমল নেই, যা সর্বাবস্থায় জারি রাখা যায়। ফলে যিকিরকারী বিছানায়, বিশ্রামরত অবস্থায় ঐ ব্যক্তির ছেড়ে অগ্রগামী হয়ে যায়, যে গাফেল অবস্থায় রাত্রী জাগরণ করে।
৪১. যিকির দুনিয়ার জীবনে নূর ও আলো, কবরের জগতে নূর ও আলো এবং আখেরাতে ও পুলসিরাতে নূর ও আলো। অন্য কিছুই বান্দাকে এত নূর ও নূরানিয়াত দান করে না।
৪২. অন্তরের একটি চাহিদা আছে, যা যিকির ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে পূরণ হয় না। যিকির যখন অন্তরে বদ্ধমূল হয় এবং অন্তরই হয় প্রকৃত যিকিরকারী। আর যবান হয় তার অনুসারী,তখন তা শুধু অন্তরের চাহিদাকেই পূরণ করে না বরং যিকিরকারীকে সম্পদ ছাড়াই ধনী করে দেয়। আত্মীয়-¯^জন ও জনবল ছাড়াই শক্তিশালী বানিয়ে দেয় এবং ক্ষমতা ছাড়াই প্রভাবশালী বানিয়ে দেয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি যিকির থেকে গাফেল সে ধন সম্পদ, আত্মীয়-¯^জন ও রাজত্ব থাকা সত্তে¡ও লাঞ্ছিত, অপমানিত ও শক্তিহীন হয়ে যায়।
৪৩. যিকির মানুষের ইচ্ছা, সংকল্প ও একগ্রতা ফিরিয়ে দেয় এবং তা শক্তিশালী করে। যিকির মানুষের অন্তরের দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী দূর করে দেয়। যিকিরের মাধ্যমে পেরেশানি দূর হয় এবং অন্তরে প্রশান্তি অসে।
৪৪. যিকির মানুষের অন্তরকে নিদ্রা থেকে জাগ্রত করে। অন্তর যখন ঘুমন্ত থাকে তখন সে লাভ ও পুঁজি দুটো থেকেই বঞ্চিত থাকে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর যখন সে জাগ্রত হয় এবং কী হারিয়েছে তা বুঝতে পারে তখন ক্ষতিপূরণের জন্য কোমর বাঁধে। গাফলতি ও উদাসীনতার গভীর নিদ্রা থেকে যিকিরই মানুষকে জাগ্রত করতে পারে।
৪৫. যিকির হল আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার প্রধান উপায়। আর যিকির হতে গাফেল থাকাই আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও নারাজির প্রধান কারণ। সুতরাং বান্দা যখন আল্লাহর যিকির করতে থাকে তখন সে আল্লাহর প্রিয় পাত্র হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি উদাসীন থাকে সে ধীরে ধীরে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায় এবং আল্লাহ তাকে অপছন্দ করতে থাকেন।
৪৬. যিকির হচ্ছে শোকর গোযারির প্রধান উপায়। যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির করে না প্রকৃতপক্ষে সে তার শোকর আদায় করে না।
৪৭. যিকিরকারীর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় এবং ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করে। আর এটাই হল পূর্ণ সফলতা ও কামিয়াবি।
৪৮. যিকিরের মজলিস হল ফেরেশতাদের মজলিস। কারণ একমাত্র যিকিরের মজলিসেই ফেরেশতারা শামিল হয়ে থাকেন।
৪৯. আল্লাহতায়ালা যিকিরকারীদের নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন।
৫০. যে ব্যক্তি যিকিরে অভ্যস্ত সে হাসতে হাসতে জান্নাতে যাবে।
৫১. যাবতীয় আমলের মূল উদ্দেশ্য হল আল্লাহর যিকির ও স্মরণ।
৫২. যে ব্যক্তি দুনিয়াতে থেকেই জান্নাতের বাগানে বিচরণ করতে চায় সে যেন যিকিরের মজলিসে শামিল হয়। কারণ এই মজলিস হল জান্নাতের বাগান।
৫৩. যিকির হল দিলের যাবতীয় রোগের চিকিৎসা। যে দিল আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন তা রোগাক্রান্ত। তার উপশমের উপায় হল আল্লাহর যিকির।
৫৪. যিকিরের দ্বারা কঠিন কাজ সহজ হয় এবং বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সুতরাং আল্লাহর যিকির এমন এক নেয়ামত, যা সকল মুশকিলকে আসান করে দেয়।
৫৫. যিকিরকারী আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সত্যবাদিতার সনদ লাভ করে, কারণ যে আল্লাহর প্রশংসা করে এবং আল্লাহর গুণাবলি বর্ণনা করে সে তার কথায় সত্য এবং আল্লাহ তাকে সত্যবাদী বলেন। আর আল্লাহ যাকে সত্যবাদী বলেন তার হাশর মিথ্যাবাদীদের সাথে হতেই পারে না।
৫৬. সমস্ত আমলের মধ্যে সেই আমল সর্বোত্তম, যাতে বেশী বেশী যিকির করা হয়। সুতরাং সর্বোত্তম রোযাদার ঐ ব্যক্তি, যে রোযার হালতে বেশী বেশী যিকির করে। সর্বোওম হাজী ঐ ব্যক্তি, যে হজ্ব আদায়কালে বেশী বেশী যিকির করে। তেমনি সর্বোত্তম মুজাহিদ ঐ ব্যক্তি, যে জিহাদের হালতে বেশী বেশী আল্লাহকে ¯^রণ করে। অন্যান্য আমলের অবস্থাও হবে একই রকম।
৫৭. যিকিরের কারণে ভয়ভীতি দূর হয় এবং প্রশান্তি লাভ হয়।
৫৮. যিকিরের দ্বারা মানুষ এক বিশেষ শক্তি লাভ করে, যার দ্বারা অতি কঠিন কাজও তার জন্য সহজ হয়ে যায়।
৫৯. যিকির হল জাহান্নাম ও আল্লাহর বান্দার মাঝে দেয়াল ¯^রূপ। বদআমলের কারণে মানুষ যখন জাহান্নামের পথে চলতে থাকে তখন যিকির তার সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই যিকির যত বেশী হবে প্রাচীর তত মজবুত ও নিশ্চিদ্র হবে।
৬০. যিকিরের দ্বারা জান্নাতে ঘর তৈরি হয়। বান্দা যখন যিকির করে ফেরেশতারা জান্নাতে তার জন্য ঘর তৈরি করেন আর যখন যিকির বন্ধ করে তখন ফেরেশতারাও তাদের কাজ বন্ধ রাখেন।
৬১. ফেরেশতারা যেমন তাওবাকারীর জন্য ইস্তিগফার করেন তেমনি যিকিরকারীর জন্যও আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করেন।
৬২. যে ভূখন্ডে আল্লাহর যিকির করা হয় তা অন্যান্য ভূখন্ডের সাথে গর্ব করে থাকে।
৬৩. বেশী বেশী যিকির করা মোনাফেকী হতে নিরাপদ থাকার উপায়। কারণ মুনাফেকরা আল্লাহতায়ালাকে খুব অল্প স্মরণ করে।
৬৪. যিকির চেহারায় সজিবতা দান করে। আর আখেরাতে নূর ও আলো দান করবে। এ কারণে দুনিয়াতে আল্লাহর যিকিরকারীর চেহারা থাকে সবচেড়ে সজীব আর আখিরাতে তা হবে সবচেড়ে নূরানী ও আলেকিত।
৬৫. যিকিরের মাঝে এক বিশেষ ¯^াদ রয়েছে, যা অন্য কোনো আমলে পাওয়া যায় না। যিকিরের মজলিসকে জান্নাতের বাগান বলা হয়।
৬৬. যবান যতক্ষণ যিকিরে মশগুল থাকবে ততক্ষণ মিথ্যা, গীবত, বেহুদা কথাবার্তা থেকে নিরাপদ থাকবে। কারণ যবান তো চুপ থাকে না, হয় আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকবে, নতুবা বেহুদা কথাবার্তায় লিপ্ত থাকবে। দিলের অবস্থাও অনুরূপ। দিল যদি আল্লাহর মহব্বতে মশগুল না হয় তাহলে মাখলুকের মহব্বতে মশগুল হবে।
৬৭. যে ব্যক্তি ঘরে-বাইরে সব জায়গায় বেশী বেশী যিকির করে কিয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্যদানকারী হবে অনেক বেশী। কারণ এসকল ভূখন্ড, বৃক্ষলতা, ঘরবাড়ি, সব তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে।
৬৮. শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন। সব সময় তাকে আতঙ্কিত করে রাখে এবং চতুর্দিক থেকে তাকে ঘেরাও করে রাখে। এর থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল আল্লাহর যিকির। যে যত যিকির করবে সে তত বেশী শয়তানের হামলা থেকে নিরাপদ থাকবে।

যিকির না করার ক্ষতিসমূহ

১. যারা যিকির করে না আল্লাহ তাদের বালা-মুসিবাত দুর করে না।
২. যারা যিকির করে না তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।
৩. যারা যিকির করে না তারা ফেরেশতাদের মাগফেরাতের দোয়া থেকে বঞ্চিত হয়।
৪. যারা যিকির করে না তাদের অন্তরের মরিচা দূর না।
৫. যারা যিকির করে না তাদের চেহারায় সজিবতা থাকে না।
৬. যারা যিকির করে না তারা শয়তানের হামলা থেকে নিরাপদ নয়।
৭. যিকির ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায় না।
৮. যিকির ছাড়া চেহারা ও অন্তর নূরানী হয় না।
৯. যিকির ছাড়া রিযিকে বরকত আসে না।
১০. যিকির ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করা যায়া না
১১. যিকির ছাড়া দিলকে জিন্দা করা যায়া না।
১২. যিকির ছাড়া আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না।
১৩. যারা যিকির করে না তারা কেয়ামতের দিন আফসোস করবে।
১৪. যিকিরের বিষয়ে উদাসীন লোকেরা গীবত, চোগলখুরী, মিথ্যাকথা, বেহুদা কথা কাজে লিপ্ত হয়ে যায়।
১৫. যিকির না করার কারনে হৃদয় মৃত হয়ে যায়।
নামায আদায় করা, রোয়া রাখা, যাকাত প্রদান করা, হজ্ব আদায় করা, তাহাজ্জুদগোর করা, সুন্নতের ওপর আমল করা, হালাল হারাম মেনে চলা, কোরআন তিলাওয়াত করাও আল্লাহর যিকির। কোরআন যেহেতু সশব্দে বা আস্তে আস্তে বা নিরবে পড়া যায়। তাই আল্লাহতায়ালার যিকিরও সশব্দে বা আস্তে আস্তে বা নিরবে করা যায়। মুমিনদের কষ্ট দেয়া কবিরা গুনাহ। তাই অন্যের কষ্ট হয় এরকম করে যিকির না করাই উত্তম। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে বেশী বেশী যিকির করার,আল্লাহকে ¯œরণ করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদের অন্তরকে আলোকিত করে দিন। যিকিরের দ্বারা আমাদের জীবন যেন সুন্দর হয় এবং আমরা যেন দুনিয়া ও আখিরাতে এর বরকত লাভ করি সেই তৌফিক দান করুন।

You may also like