Home ইতিহাস বিডিআর হত্যাযজ্ঞ শহীদ সেনা কর্মকর্তা: কর্ণেল ইলাহী

বিডিআর হত্যাযজ্ঞ শহীদ সেনা কর্মকর্তা: কর্ণেল ইলাহী

by Jafor Salah
০ comment

২৫-২৬ ফেব্র“য়ারি ২০০৯ এ পিলখানায় নির্মমভাবে শাহাদাতবরণকারী অফিসারদের মধ্যে আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ট ছিলেন শহীদ কর্ণেল ইলাহী। তাই তাঁকে নিয়েই আমার প্রথম লেখা।
পুরো নাম কুদরত ইলাহী রহমান শফিক। আমার দেখা দেশ ও বিদেশের হাজার হাজার অফিসারদের মধ্যে তীক্ষè ধীসম্পন্ন, চটপটে, বুদ্ধিমান, প্রত্যুৎপন্নোমতি ইলাহী অন্যতম। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) তে আমি ওকে ৬ মাস দেখেছি। এরপর আরও পাঁচবার আমরা একসাথে, কাছাকাছি থেকে বিভিন্ন র্যাংকে ও বিভিন্ন দায়িত্বে চাকরি করার সুযোগ পেয়েছি। সব দিক মিলিয়ে সে আমার দেখা সেরা অফিসারদের মধ্যে একজন।
কর্ণেল ইলাহীকে আমি প্রথম দেখি ১৯৮১ সালের সম্ভবত জুলাই মাসে। একাডেমিতে (বিএমএ, যা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে অবস্থিত) আমি যখন ফাইনাল টার্মে বিএসইউও (BSUO- Battalion Senior Under Officer) এর দায়িত্ব পালন করছি তখন ইলাহী প্রথম টার্মে ৮ম বিএমএ লং কোর্সের নতুন ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করে। একাডেমিতে BSUO এবং ফার্স্ট টার্মের ক্যাডেটের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান, দেখা-সাক্ষাৎ খুব কমই হয়। যা হোক, খুব শীঘ্র জানলাম যে, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের ভাগ্নে, ইলাহী ফার্স্ট টার্মের ক্যাডেট। স্রেফ কৌতূহলবশতঃ মাঝে মাঝে দূর থেকে দেখেছি, ২/১ বার হয়তো “hello”, “how are you” ধরনের কথাও বলেছি। ১৯৮১ এর সেপ্টেম্বর/ অক্টোবরের দিকে সেনাপ্রধান একাডেমি ভিজিট করতে গেলেন। BSUO হিসেবে আমি তাঁকে ক্যাডেট ব্যাটালিয়নে অভ্যর্থনা জানালাম। সেদিন তিনি ভাগ্নেকে ডেকে কুশল বিনিময় করেছিলেন। ডিসেম্বর ১৯৮১ তে আমি যখন কমিশন লাভ করে একাডেমি ত্যাগ করি, তখন সে ফার্স্ট টার্ম থেকে খুব ভাল রেজাল্ট করে ২য় টার্মে উত্তীর্ণ হয়।
আমি কমিশন লাভ করে ঢাকা সেনানিবাসে ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেড এর অধীনে ৭ম ইস্ট বেংগলে যোগদান করি। ১৯৮৩ এর সম্ভবত জুন মাসে ইলাহী কমিশন লাভ করে একই ব্রিগেডের অধীনস্থ পাশের ইউনিট, ৩য় ইস্ট বেংগলে যোগদান করে। তখন তাকে কিছুটা কাছাকাছি দেখার সুযোগ পাই। বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের interaction হয়। ধীরে ধীরে তার মেধা, যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলী ইত্যাদি আমাকে তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও স্নেহশীল করে তোলে। ঢাকায় তখন মার্শাল ল’ এর কঠিন দিন – সে সময় আমরা একসঙ্গে মার্শাল ল’ এর বিভিন্ন কাজ করারও সুযোগ পেয়েছি।
সে বছরই (১৯৮৩) আমাদের ব্রিগেড এর ভারী অস্ত্র ফায়ারিং দলের সাথে আমরা দুজনেই একত্রে আরো অফিসার ও সৈনিক সহ চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে যাই। সে সময় আরো ঘনিষ্টভাবে ইলাহীকে দেখার সুযোগ পাই। ব্রিগেড ফায়ারিং টিমের সর্বকণিষ্ঠ অফিসার হিসেবে তাকে দেখেছি উৎসাহের সাথে দিনরাত পরিশ্রম করে নিজের কাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি অন্যদের কাজেও সহায়তা করতে। প্রখর দায়িত্ববোধসম্পন্ন ইলাহী স্বপ্রণোদিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে, তা পালনে নিজেকে সর্বাত্মক নিয়োগ করতো। সবচেয়ে প্রশংসনীয় হলো, সে একদম চুপচাপ কাজ করে যেতো, কোন হৈ চৈ বা বাগাড়ম্বর করতো না – ‘‘silent worker’’ যাকে বলে। তাকে সার্বক্ষণিক কাজ করতে দেখে মনে হতো যে, সে মনে হয় বিশ্রামই নেয় না এবং ঘুমালেও খুব অল্প সময়ের জন্যই ঘুমায়। আমার স্মৃতিতে, সবার শেষে বিছানায় যাওয়া এবং সবার আগে কাজ শুরু করাই ছিল তাঁর সেই দিনগুলোর রুটিন।
জানুয়ারি ১৯৮৪তে আমি আমার ইউনিট ৭ম ইস্ট বেঙ্গল সহ পার্বত্য রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার অন্তর্গত মাইনিমুখ এলাকায় সন্ত্রাস দমন অভিযানের দায়িত্ব পালনের জন্য যাই। সেখান থেকে ১৯৮৫ এর নভেম্বরে ক্যাপ্টেন র‌্যাংকে বদলি হয়ে বান্দরবান সদরে ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড এর অপারেশনস্ স্টাফ অফিসার হিসেবে যোগ দেই। প্রায় একই সময় এই ব্রিগেড এর অধীনে ঢাকা থেকে আলীকদম উপজেলায় সন্ত্রাস দমন অভিযানে মোতায়েন হয় ৩য় ইস্ট বেঙ্গল। আমার ব্রিগেড কমান্ডার সেই ইউনিট পরিদর্শনে গেলে আমিও স্টাফ অফিসার হিসেবে সাথে যাই। আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম ঢাকায় একত্রে চাকরি করা ৩য় ইস্ট বেঙ্গল এর সেই পরিচিত মুখগুলো দেখবো বলে। কিন্তু, যখন আলীকদম পৌঁছলাম তখন ২ জন ছাড়া বাকি সবাই অপরিচিত দেখলাম। তবে, সেই দুই জনের মধ্যে ইলাহীকে দেখে খুব খুশি হলাম। সেও খুব খুশি হলো। ইলাহী তখন ইউনিটের কোয়ার্টার মাস্টার (লজিস্টিক অফিসার) এর দায়িত্ব পালন করছিল। অত্যন্ত ব্যস্ততা তার, কিন্তু এর মাঝেও সে ঘুরে-ফিরে এসে আমার খোঁজ-খবর নিচ্ছিল- আমি কেমন আছি, কোন সমস্যা আছে কি না, কোন কিছুর প্রয়োজন আছে কি না ইত্যাদি। দিনরাত ১৬-১৮ ঘণ্টা ব্যস্ততার পরও তার মুখে হাসি, বিরক্তি বা ক্লান্তির কোন চিহ্ন নেই। এত কর্ম ব্যস্ততার পরও আমার প্রতি পরম নিকটাত্মীয়ের মত আদর যতেœর তার যে মনোভাব তা ছিল বিরল। আমি পরদিন কমান্ডার এর সাথে বান্দরবান ফিরে এলাম। এরপর, ইলাহীর সাথে ওয়্যারলেস এর মাধ্যমে নিয়মিত কথা হতো।
এর মধ্যে, সম্ভবত ১৯৮৬ এর মাঝামাঝি অথবা ১৯৮৭ এর শুরুতে জানলাম ইলাহী সিলেটে ট্রেনিং এ যাচ্ছে। আমি তাকে লিখিতভাবে বেশ বড় করে কি কি করণীয় তা উপদেশ আকারে পাঠালাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম, সে ভাল করবেই। তবুও, কিছু ‘টিপস্’ জানা থাকলে ভাল হয় ভেবে এবং ইলাহীর মত অফিসারকে কিছু সাহায্য করতে পেরে নিজে খুশি হবো চিন্তা করেই তা পাঠালাম। সেও তা পেয়ে খুব খুশি হলো এবং ট্রেনিং এ যাবার প্রাক্কালে প্রস্তুতিমূলক যা যা করার বা পড়ার পরামর্শ ছিল তা নিষ্ঠার সাথেই সম্পন্ন করল। কোর্সে যোগদান করে সে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে; সম্ভবত প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। সে ইউনিটে ফিরতে ফিরতে আমি বদলি হয়ে যাই। আমাদের যোগাযোগ সাময়িক বিচ্ছিন্ন থাকে।
১৯৮৯ এর মাঝামাঝি মেজর পদবীতে আমি সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টে, স্কুল অ্যান্ড ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাক্টিক্স এর কৌশল শাখাতে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। প্রশিক্ষকদের সেখানে ডিএস (DS – Directing Staff) বলা হয়। সেখানে ক্যাপ্টেন ইলাহীকে আমার সহকর্মী হিসেবে পেয়ে আমরা উভয়েই খুশি হই। সেবার প্রায় আড়াই বছর আমরা অত্যন্ত কাছাকাছি একত্রে চাকরির সুযোগ পাই। আমরা তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদবীর অফিসারদের যুদ্ধের কলাকৌশল শিক্ষাদানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম। রণকৌশল এমন এক বিষয় যেখানে চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, ব্যতিক্রমধর্মী রণ-পরিকল্পণা ইত্যাদির উৎকর্ষতা থাকলে অত্যন্ত সুচারুরুপে যুদ্ধ পরিকল্পনা করা সম্ভব এবং সে ক্ষেত্রে সফলতার সম্ভাবনা অধিক। “Thinking out of the box’’ অর্থাৎ, প্রচলিত ধারার বাইরে চিন্তা করার এক অবিশ্বাস্য মেধা ছিল ইলাহীর। তখনকার দিনে এখনকার মত “out the box” চিন্তা করার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া তো দূরের কথা, বরং তা নিরুৎসাহিত করা হতো। এতে করে ইলাহী অনেক সিনিয়রের বিরাগভাজনও হয়েছে। সে যখনই যুদ্ধের কলাকৌশল নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী “out the box” কোন সমাধান প্রস্তাব করেছে তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু, সে কখনো দমে যায়নি। আমি সহ আরো ২/ ১ জন ছিলাম, যারা ইলাহীর সাথে এসব ভিন্নধর্মী যুদ্ধের কলাকৌশল নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করে তৃপ্ত হতাম। বলা বাহুল্য, ওর গভীর ও সুক্ষ্ম চিন্তাশক্তি প্রসূত পরিকল্পনা থেকে আমিও অনেক নতুন কিছু শিখেছি, আইডিয়া পেয়েছি। ১৯৯২ এর জানুয়ারিতে আমি পিএসসি করার জন্য সিলেট ত্যাগ করলে আমাদের মধ্যে আবার যোগাযোগ ব্যহত হয়।
দীর্ঘ প্রায় ১ যুগ পর, ২০০৪ এ আমি লে. কর্ণেল র‌্যাংকে মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত স্টাফ কলেজে ‘পিএসসি’ বা স্টাফ কোর্সের ডিএস হিসেবে যোগ দিলে এখানেও লে. কর্ণেল ইলাহীকে আবার সহকর্মী হিসেবে পাই। এখানে তিন বাহিনীর (আর্মি, নেভী, এয়ার ফোর্স) দেশি ও বিদেশি প্রায় ১৩০/ ১৪০ জন মেজর ও লে. কর্ণেলকে যুদ্ধের কলাকৌশল শিক্ষা দেয়া হয়। সিলেটের মত এখানেও আমরা উভয়েই উভয়ের সাথে কাজ করে আনন্দিত হয়েছি, উপকৃত হয়েছি। রণকৌশলগত যে কোন জটিল সমস্যা নিয়ে তার সাথে আলোচনা করলে সে খুব সহজেই একাধিক সমাধান বের করতে পারতো। ওর জ্ঞানের গভীরতা, চিন্তার সুক্ষ্মতা এবং যুদ্ধের ময়দানের বাস্তব চিত্র অনুধাবনের প্রখর শক্তির কারণেই এটা সম্ভব ছিল। স্টাফ কলেজে একই দায়িত্বে চাকরি করাকালীন ২০০৪ এর শেষে আমি কর্ণেল র‌্যাংকে পদোন্নতি পেয়ে সেখানেই ঊর্ধ্বতন দায়িত্বে নিয়োগ পেলে ইলাহী বছর খানেক আমার সরাসরি অধীনস্থ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। ২০০৫ এর শেষে আমি বদলি হয়ে গেলে আবার আমাদের মাঝে কয়েক বছরের দেখা-সাক্ষাৎ ব্যহত হয়।
ব্রিগেডিয়ার র‌্যাংকে ২০০৭-২০০৮ এ এনডিসি কোর্স সম্পন্ন করে আমি জানুয়ারি ২০০৮ এ দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত পার্বতীপুর উপজেলায় ১৬ পদাতিক ব্রিগেড এর কমান্ডার হিসেবে যোগদান করি। তখন সারা দেশে ১/১১ পরবর্তী সেনা মোতায়েন ছিল। তাই, সেখানে ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও এই দুই জেলার অন্য সকল কাজ আমাকে তদারকি করতে হতো। তাতে করে, ঐ দুই জেলার বেসামরিক প্রশাসনের সকল কাজের জন্যই ডিসি, এসপি এবং জেলা পর্যায়ের সরকারের সকল বিভাগের কর্মকর্তারা আমার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতেন। আমি তাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে দিক নির্দেশনা, পরামর্শ, উপদেশ, আদেশ দিতাম।
অপারেশন কার্যক্রমের জন্য বিজিবি (তৎকালীন বিডিআর) এর দিনাজপুর সেক্টরের সেক্টর সদর সহ ঐ দুই জেলায় মোতায়েনকৃত ব্যাটালিয়নসমূহও ১৬ পদাতিক ব্রিগেডের অধীনস্থ ছিল। সে হিসেবে সেক্টর কমান্ডার বিজিবি, ১৬ পদাতিক ব্রিগেড কমান্ডারের অধীনস্থ। ২০০৮ এর দ্বিতীয়ার্ধ্বের কোন এক সময় কর্ণেল ইলাহী দিনাজপুরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যোগদান করে। সে যোগ দিয়েই আমাকে ফোন করে তা জানায়। আমরা দু’জনেই দু’জনকে আবার কাছাকাছি পেয়ে খুব খুশি হই। আমার দায়িত্বপূর্ণ এলাকার আর্মি ও বিজিবি’র মধ্যে আমার ব্রিগে. জেনারেল র্যাংকের পরেই সেক্টর কমান্ডার এর কর্ণেল র্যাংক, এরপর আছে সব ব্যাটালিয়ন অধিনায়কগণ, যাদের র্যাংক লে. কর্ণেল। সুতরাং, অফিসারদের সিনিয়রিটি অনুযায়ী ইলাহীর অবস্থান আমার ঠিক পরেই। তাই, সে সব সময়ই বলতো, “স্যার, আমি আপনার টু-আইসি’’ (2IC- Second in Command বা উপ-অধিনায়ক)। আমি মাসে অন্তত দু’বার জেলাগুলোতে নানান কাজ উপলক্ষে যখন যেতাম, তখন ইলাহীর সাথে দেখা হতো, কথা হতো। এছাড়া, প্রায়ই আমাদের ফোনে কথা হতো। আমাদের মাঝে কত রকমের যে কথা হতো তার কোন কূল কিনারা নেই। আমাদের গল্পের কোন এজেন্ডা ছিল না – পৃথিবীর সব কিছু নিয়ে আমরা গল্প করতাম। ওর সাথে কথা বলে খুব ভাল লাগতো, অনেক কিছু শিখাও যেত। ওকে বলতাম যে, “তোমাকে দেখলে একটি ইংরেজি বাক্য খুব মনে পড়ে”। বাক্যটি হলো, “Some people have wonderful presence; some others have wonderful absence’’ – তোমার ক্ষেত্রে প্রথমটা প্রযোজ্য। ফেব্র“য়ারি ২০০৯ এর আগ পর্যন্ত সে দু’বার আমার সাথে দেখা করতে ক্যান্টনমেন্টে এসেছে – একবার ওর পরিবারের ৮/ ১০ জন সদস্য সহ; আরেকবার আমাদের অপর এক কলিগের ছেলেকে নিয়ে।
২০০৯ এর ফেব্রুয়ারিতে “বিডিআর সপ্তাহ” উপলক্ষে ইলাহী ঢাকায় আসার আগেও আমার সাথে কথা বলেছে। সম্ভবত: ২৩ শে ফেব্রুয়ারিতে আমার সাথে শেষবারের মত ফোনে ওর কুশল বিনিময় হয়েছে। অভিশপ্ত ২৫ শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার অঘটনের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে আমি ফোনে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। রিং বেজে গেলেও কেউ ধরেনি। ২৫ ও ২৬ দু’দিনই ফোনে অনেক চেষ্টা করেও ওকে আর পাইনি।
একাডেমি জীবনের পর ইলাহীর সাথে মোট পাঁচ বার চাকরি করার সুযোগ হয়েছে, দু’বার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে। আগেই বলেছি, একবার সে বছর খানেকের জন্য আমার সরাসরি অধীনস্থও ছিল। আমার চাকরি জীবনে বহু অফিসারের ও সৈনিক এর বাৎসরিক প্রতিবেদন (ACR – Annual Confidential Report) লিখতে হয়েছে। আমার মনে আছে ২০০৪-২০০৫ এ ইলাহী মিরপুর স্টাফ কলেজে আমার অধীনস্থ থাকার সময় তাকে আমি যে ACR দিয়েছিলাম, তা আমার লেখা শ্রেষ্ঠ ACR, অর্থাৎ আমি যত অফিসার ও সৈনিককে ACR দিয়েছি, সবচেয়ে ভালো ACR দিয়েছি ইলাহীকে। আমি দয়া করে তাকে এমন ACR দেইনি – সে তার যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা দিয়েই তা অর্জন করেছিল।
বিদ্যা, বুদ্ধি, মেধা, মনন, সৃজনশীলতা ও মননশীলতার এক অনন্যসাধারণ সমন্বয় দেখেছি ইলাহীর মাঝে। তার স্বকীয়তা এবং উদ্ভাবনী চিন্তা ছিল অনবদ্য। ইলাহী নিঃসন্দেহে আমার দেখা শ্রেষ্ঠ অফিসারদের পুরোভাগে সবসময় স্থান করে নিয়েছিল। চিন্তার স্বচ্ছতা, জ্ঞানের গভীরতা এবং প্রকাশের ক্ষমতা তাকে করেছে বলিষ্ঠ ও আত্মবিশ্বাসী এক ব্যক্তি। এত গুণে গুণান্বিত হয়েও ইলাহী ছিল নিরংহকারী, মার্জিত, পরিপাটি বিরল এক প্রতিভা। মানবিক গুণাবলীতে একজন পরিপক্ক মানুষ ইলাহী আমার জানা মতে কোনদিন কারো কোন ক্ষতি করেনি বা জেনে বুঝে ইচ্ছে করে কাউকে এতটুকু কষ্টও দেয়নি। বরং সব সময় সবার প্রতি তার সহযোগিতার মনোভাব ছিল তুলনাহীন।
ইলাহীর মত যোগ্য, দক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ অফিসার এবং ভাল মানুষ হতে হলে অনেক সাধনার প্রয়োজন। ইলাহীর বিদায় দেশের জন্য, সেনাবাহিনীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ইলাহী নেই, আমি এখনো তা ভাবতেই পারি না। মনে হয়, স্বল্পভাষী, নিরংহকার, মেধাবী ও তুখোড় এই অফিসার যে কোন সময় তার সদাহাস্য মুখটাতে এক ঝিলিক হাসি ছড়িয়ে আমার সামনে উপস্থিত হবে। কিন্তু, বাস্তবতা অনেক কঠিন ও রূঢ়। ও, চলে গেছে না ফেরার দেশে। আল্লাহ যেন তাকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে জান্নাতে স্থান দেন এই দোয়া করি।
লেখক: আব্দুলাহিল আজম আজমী

You may also like