Home ইসলাম নামায কিভাবে পড়বো পর্ব -১ (নামাযে কি কি পড়তে হয়)

নামায কিভাবে পড়বো পর্ব -১ (নামাযে কি কি পড়তে হয়)

by admin
০ comment

নামায কিভাবে পড়বো পর্ব -১

(নামাযে কি কি পড়তে হয়)

মোহাম্মদ আবুল হোসাইন চৌধুরী

নাজাসাত বা অপবিত্রতা

. নাজাসাত বা অপবিত্রতা

নাজাসাত কী ও কেন?

বিভিন্ন বস্তু পবিত্র করার উপায়

মল-মূত্র ত্যাগের সঠিক নিয়ম

হাদীসের আয়নায় ইস্তেঞ্জা (শৌচকার্য)

পানির বিবরণ

নাজাসাত কী ও কেন?

নামায কিভাবে পড়বো এবং নামাযে কি কি পড়তে হয়- এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে নামাযের প্রস্তুতিমূলক দুটি বিষয়ে আমাদেরকে সম্যক ধারণা অর্জন করতে হবে। তারমধ্যে একটি নাজাসাত বা অপবিত্রতা আর অপরটি তাহারাত বা পবিত্রতা। এ দুটি বিষয়ের ধারণা ছাড়া আমাদের নামায সহীহ-শুদ্ধ হবে না। নামায সহীহ-শুদ্ধ না হলে নামাযের দ্বারা অন্তরাত্মার যে পরিশুদ্ধির কথা কালামে পাকে বলা হয়েছে তা অর্জনও আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। তাই পবিত্রতার বিষয়ে পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এ অধ্যায়ে নাজাসাত সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করা হলো।

শরীর থেকে যেসব জিনিস বের হওয়ার কারণে শরীর নাপাক হয়ে যায়, অথবা যেসব দ্রব্য কোনো পাক বস্তুতে লাগলে তা নাপাক হয়ে যায় তাকে ‘নাজাসাত’ নাপাকী বা অপবিত্রতা বা অপবিত্র জিনিস বলা হয়। নাজাসাত দু’প্রকার : ১. নাজাসাতে হাকিকী ও ২. নাজাসাতে হুকমী।

১. নাজাসাতে হাকিকী :

যা স্পর্শ করা যায় এবং দৃষ্টিগোচর হয় তাকে নাজাসাতে হাকিকী বলে। প্রস্রাব, পায়খানা, রক্ত, বীর্য ও মদ প্রভৃতি বস্তু এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। কোনো পবিত্র দ্রব্যে এসব নাপাক জিনিস লাগার পর পবিত্র পানি দিয়ে এসব বস্তু ভালরূপে পরিষ্কার করলে এসব পবিত্র হয়ে যায়।

২. নাজাসাতে হুকমী :

যা স্পর্শ করা যায় না এবং দৃষ্টিগোচরও হয় না তাকে নাজাসাতে হুকমী বলে। শরীর থেকে বায়ু নির্গত হওয়া, অযু ভঙ্গ হওয়া ও গোসল ফরয হওয়া প্রভৃতি এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। অযু ও গোসল করা ছাড়া এগুলো থেকে পাক হওয়া যায় না।

নাজাসাতে হাকিকী আবার দু’প্রকার :

ক. নাজাসাতে গলীযা ও

খ. নাজাসাতে খফীফা।

ক. নাজাসাতে গলীযা :

যে নাপাকী খুব গাঢ় তা নাজাসাতে গলীযা। হারাম জন্তু এবং মানুষের প্রস্রাব ও পায়খানা, গৃহপালিত পশু-পাখির মল-মূত্র, বীর্য, নির্গত রক্ত প্রভৃতি নাজাসাতে গলীযা। স্তন্যপায়ী সন্তানদের প্রস্রাব-পায়খানাও নাজাসাতে গলীযা। নাজাসাতে গলীযা যদি তরল ও হালকা অথবা প্রচলিত ধাতব টাকার পরিমাণ অথবা হাতের তালুর গহ্বর পরিমাণ পর্যন্ত নাপাকী অবস্থায় নামায শুদ্ধ হবে। তবে তা মাকরূহে তাহরীমি হবে। সুযোগ থাকলে এ অবস্থায়ও পবিত্রতা অর্জনের পরই নামায পড়া উত্তম। তবে এ অবস্থা থেকে পবিত্র হতে গিয়ে যদি নামায কাজা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে নামায পড়ে নেয়া যাবে।

খ. নাজাসাতে খফীফা :

যে নাপাকী কিছু হালকা তা নাজাসাতে খফীফা। সকল প্রকার হালাল ও হারাম পাখির মল নাজাসাতে খফীফা। নাজাসাতে খফীফা কোনো কাপড়ে বা শরীরে লাগলে শরীর বা কাপড়ের যে অংশে লাগবে যদি উক্ত নাপাকী তার এক চতুর্থাংশের চাইতে কম পরিমাণ স্থানে লেগে থাকে তবে তা মাফ কিন্তু যদি পূর্ণ এক চতুর্থাংশ বা ততোধিক স্থানে লেগে থাকে তবে এ অবস্থায় নামায শুদ্ধ হবে না। নাজাসাতে খফীফা দু’প্রকার :

১.       নাজাসাতে হদসে আসগর ও

২.       নাজাসাতে হদসে আকবর।

১. নাজাসাতে হদসে আসগর :

যেসব নাপাকী শুধু অযু দ্বারা দূর হয়ে যায় তাকে নাজাসাতে হদসে আসগর বলে। যেমন পায়খানা, প্রসাব এবং মলদ্বার দিয়ে বায়ু ইত্যাদি নির্গত হলে কেবল অযু করলেই শরীর পবিত্র হয়ে যায়।

২. নাজাসাতে হদসে আকবর :

যেসব নাপাকী শুধু অযু দ্বারা দূর হয়না বা যে ক্ষেত্রে নাপাকী থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য গোসলের প্রয়োজন হয় তাকে নাজাসাতে হদসে আকবর বলে। যেমন কামভাবে শুক্রপাত, মহিলাদের গুপ্তাঙ্গে পুরুষের গুপ্তাঙ্গ প্রবেশ করানো অথবা মহিলাদের হায়েজ (মাসিক ঋতুস্রাব) ও নেফাস (বাচ্চা প্রসবের পরের রক্তস্রাব) শেষ হলে গোসল ছাড়া শরীর পাক হয় না।

মাছের রক্ত, মশা, মাছি ও ছারপোকার ভুক্ত রক্ত পবিত্র। প্রস্রাবের ছিটা সূঁচাগ্রভাগ পরিমাণ হলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে এর চেয়ে বেশি হলে আক্রান্ত জায়গা বা কাপড়চোপড় ধুয়ে ফেলতে হবে নতুবা নামায শুদ্ধ হবে না। যেসব হালাল পাখি শূন্যে মলত্যাগ করে এদের মল পাক। কুকুরের লালা এবং শূকরের যে কোনো বস্তু সম্পূর্ণ অপবিত্র।

বিভিন্ন বস্তু পবিত্র করার উপায়

ক. জমাট নাপাক বস্তু :

কোনো বস্তুতে পায়খানা ও রক্ত লাগলে প্রথমে উক্ত ময়লা অপসারিত করতে হবে। এরপর তা তিনবার ধুয়ে ব্যবহার করতে হবে। যদি তিন বারেও নাপাকি দূর না হয় তবে নাপাকি দূর না হওয়া পর্যন্ত ভালরূপে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

খ. তরল নাপাক বস্তু :

পেশাব বা এ জাতীয় কোন নাপাক তরল পদার্থ কাপড়ে লাগলে তিন বার উত্তমরূপে নিংড়িয়ে ধৌত করতে হবে। কিন্তু শেষবারে সাধ্যানুযায়ী জোরে নিংড়াতে হবে; নচেৎ কাপড় পাক হবে না। শরীর বা কাপড়ে যেকোন নাপাক দ্রব্য লাগলে তা না ধুয়ে শুধু নিংড়ালে পাক হবে না।

গ. শক্ত ধাতব বস্তু :

আয়না, চাকু, ছুরি, লোহা, তামা, কাঁসা এবং স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলঙ্কার প্রভৃতি নাপাক হয়ে গেলে উত্তমরূপে ঘঁষে-মেজে ধুলে পাক হবে। বড় বিছানার এক কোণা নাপাক হলে বাকি সব পাক থাকলে পাক স্থানে দাঁড়িয়ে নামায পড়া জায়েয হবে।

গোবর বা নাপাক দ্রব্য দ্বারা জমিন লেপন করলে তা নাপাক হয়ে যাবে। এর উপর কোনো পাক বিছানা না বিছিয়ে নামায পড়লে উক্ত নামায জায়েয বা সহীহ হবে না।

মল-মূত্র ত্যাগের সঠিক নিয়ম

টুপি বা কোনো কাপড় মাথায় দিয়ে পায়খানা ও প্রস্রাবখানায় যেতে হবে। খালি মাথায় যাওয়া দূষণীয়। উভয় স্থানে প্রথমে বাম পা বাড়িয়ে প্রবেশ করতে হবে এবং বাম পায়ের উপর ভর দিয়ে উত্তর বা দক্ষিণমুখী হয়ে বসতে হবে। কখনো কেবলামুখী হয়ে অথবা কেবলাকে পিছ করে বসতে নেই; এটি গুনাহ। এ বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য শহরে হোক চাই গ্রামে হোক পায়খানা এবং প্রস্রাবখানা (ঞড়রষবঃ) অবশ্যই উত্তর এবং দক্ষিণমুখী করে তৈরি করতে হবে। অধিকাংশ গ্রামে ফাউন্ডেশন করা বহুতল ভবন থাকে না কাজেই ভুল বশত: গ্রামের কোনো টয়লেট এর ব্যতিক্রম হলেও পরবর্তীতে পূর্বেরটি ভেঙ্গে সংস্কার করা সম্ভব।

প্রসঙ্গত: উল্লেখযোগ্য, ঢাকা শহরে আমরা একটি বহুতল ফ্লাট বাসা ভাড়া নেয়ার সময় বিষয়টি আমাদের গোচরীভূত হয়নি। পরবর্তীতে ব্যবহারের সময় দেখা গেলো উক্ত বাসার একটি টয়লেট পূর্বমুখী। বাড়িওয়ালা খুবই মোখলেস এবং পরহেজগার মানুষ। বিষয়টি তার গোচরীভূত করায় তিনি জবাব দিলেন, ‘আমি সৌদি আরবে চাকরিতে থাকাকালে আমার প্রতিনিধি বিল্ডিংটি করেছেন। তিনি তখন বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেননি।’ আমি বললাম, ‘আপনি এখন সৌদির চাকরি শেষে বাংলাদেশে আছেন, কেবলামুখি হয়ে এস্তেঞ্জা না করার গুরুত্ব আপনি বুঝেন।’ তখন তিনি উত্তর দিলেন, এতো বড় সাততলা ফাউন্ডেশন করা ডাবল ইউনিটের বাড়ির ১৪টি বাথরুম ভেঙ্গে কি আর নতুন করে করা সম্ভব? অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে এ বাড়িতে যারা আসবেন তাদেরকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়েই কেবলার দিকে পেছন দিয়ে এস্তেঞ্জা করতে হবে।

নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত হচ্ছে প্রস্রাব-পায়খানার পর প্রথমে ঢিলা ব্যবহার করা এবং অতঃপর পানি দিয়ে ধুয়ে পবিত্রতা অর্জন করা। স্বাস্থ্য সচেতন কোনো লোক নিজের মলমূত্র নিজহাতে স্পর্শ করেনা। এটি রুচি বিরোধী ও অত্যন্ত অপবিত্র কাজ। এটি স্বাস্থ্যসম্মতও নয়। কারণ মলমূত্র থেকে অনেক জীবাণু হাতের মাধ্যমে শরীর ও অন্যান্য স্থানে সংক্রমিত হতে পারে।

হাদীসের আয়নায় ইস্তেঞ্জা (শৌচকার্য)

১.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইস্তেঞ্জা করার সময় ডানহাত ব্যবহার করবে না এবং কোনো বরতন বা পাত্রে মলমূত্র ত্যাগ করবে না। (আবু দাউদ ও আন-নাসায়ী)

২.হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবার লোকদের বললেন, আল্লাহ্ তোমাদের পবিত্রতার খুবই প্রশংসা করেছেন। তিনি কুবার লোকদের নিকট জানতে চাইলেন, এর রহস্য কী? তারা উত্তর দিলেন, আমরা ঢিলা ও পানি উভয়টি দ্বারাই পবিত্রতা অর্জন করি। (আবু দাঊদ ও মুসনাদে আহ্মাদ)

৩.হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইস্তেঞ্জার পর পবিত্রতা লাভের জন্য বামহাত ব্যবহার করবে। (আবু দাঊদ)

৪.হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনের আগে ঢিলা ব্যবহার করবে। (আবু দাঊদ ও আন-নাসায়ী)

এখানে ঢিলা বলতে মাটির টুকরাকে বোঝানো হয়েছে। বর্তমানে এর বিকল্প হিসেবে টিস্যু পেপার ব্যবহার হচ্ছে। এ সম্পর্কিত নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীসমূহ প্রত্যেক হাদীস গ্রন্থের ‘কিতাবুত তাহারাত’ অধ্যায়ের ইস্তেঞ্জা পরিচ্ছেদে বিশদভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। যে সকল লোক মলত্যাগের পর পানি দিয়ে শৌচকার্য করেনা বা শুধুমাত্র কাগজ ব্যবহার করে, তাদের বেশ কয়েক ধরনের রোগ সৃষ্টি হতে পারে। যেমন, মলদ্বারের আশপাশে ফোঁড়া এবং গোদের মধ্যে পুঁজ, যা প্রস্রাবের সময় বের হয়ে আসে। তাই পানি দিয়ে মলমূত্র ত্যাগের স্থানসমূহ পরিষ্কার করার আগে কোনো ঢিলা বা টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে নেয়া উচিত। তবে গোবরের ঢিলা ব্যবহার করতে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন।

৫.হযরত আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলা হলো, আপনাদের নবী প্রতিটি বিষয় আপনাদের শিক্ষা দিয়েছেন; এমনকি পায়খানা-পেশাবের শিষ্টাচার পর্যন্ত। সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হ্যাঁ, তিনি আমাদের কিবলামুখী হয়ে পায়খানা-পেশাব করতে, মল ত্যাগের পর ডান হাত দিয়ে ইস্তেঞ্জা (মল ত্যাগের জায়গা পরিষ্কার করা ও পবিত্রতা অর্জন করা) করতে নিষেধ করেছেন। তিনি কাউকে তিনটি ঢিলার কম দিয়ে ইস্তেঞ্জা করতে এবং শুকনো গোবর অথবা হাড় দিয়ে ইস্তেনজা করতে নিষেধ করেছেন। (জামে আত-তিরমিযী ও আন-নাসায়ী)

৬.আবু কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যেনো পানি পান করার সময় পাত্রে নিশ্বাস না ফেলে। আর পায়খানায় এসে কেউ যেনো ডান হাত দ্বারা পুরুষাঙ্গ স্পর্শ না করে এবং সে যেন ডান হাত দ্বারা শৌচক্রিয়া না করে। (সহীহ আল বোখারী)

৭. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা শুকনো গোবর আর হাড় দিয়ে ইস্তেঞ্জা করবে না। (জামে আত-তিরমিযী ও আন-নাসায়ী)

৮. হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডানহাত ছিলো খাদ্য গ্রহণ ও অজু করার জন্য, আর বাম হাত ছিলো মলমূত্র ত্যাগের পর উক্ত স্থান পরিষ্কার করার জন্য। (আবু দাঊদ)

৯. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম শৌচ করার পর মাটিতে তাঁর হাত ঘষে পরিষ্কার করতেন এবং অযু করতেন। (আন-নাসায়ী)

১০. হযরত জারীর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি     ওয়াসাল্ল¬ামের সাথে ছিলাম। তিনি একদা পায়খানায় গেলেন এবং প্রয়োজন সমাধা করে বললেন, হে জারীর! পানি আনো। অতএব আমি তাঁকে পানি এনে দিলাম। তিনি পানি দিয়ে শৌচকার্য করলেন এবং পরে পানি দিয়ে হাত মাটিতে ঘষলেন। (আন-নাসায়ী)

১১. হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের পিতৃতুল্য। আমি তোমাদের শিক্ষা দেই। যখন কেউ টয়লেটে যায়, সে যেনো কিছুতেই কিবলামুখী হয়ে বা কিবলাকে পেছনের দিকে রেখে না বসে। আর মলত্যাগের পর উক্ত স্থান যেন ডানহাত দিয়ে পরিষ্কার না করে। (আবু দাঊদ ও আন-নাসায়ী)

১২. হযরত আবু আইয়ূব আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন যে, নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা কেউই কিবলামুখী হয়ে বা কিবলা পেছনে রেখে মলমূত্র ত্যাগ করবে না। (সহীহ আল বোখারী, সহীহ মুসলিম ও আন-নাসায়ী)

১৩.আবু আইয়ূব আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো বলেন, আমরা যখন সিরিয়ায় এলাম তখন দেখতে পেলাম সেখানকার টয়লেটগুলো কিবলামুখী করে নির্মাণ করা হয়েছে। তখন আমরা আমাদের মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিই এবং আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। (সহীহ মুসলিম ও আবু দাঊদ)

১৪.আব্দুল্লাহ ইবনে সারজিস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো গর্তে প্রস্রাব করতে নিষেধ করেছেন। (আবু দাঊদ ও আন-নাসায়ী)

এর সম্ভাব্য কারণ গর্তে সাপ বা বিষাক্ত কীট-পতঙ্গ থাকতে পারে যা বের হয়ে কামড় দিতে পারে। অপরদিকে দুর্বল কীটপতঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হাদীসগুলোর সবই যৌক্তিক ও বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যশীল।

১৫.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা দুটো বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকো, যা আল্লাহ্র অভিসম্পাতের কারণ স্বরূপ। উপস্থিত সাহাবীরা বলে উঠলেন, সে দুটো জিনিস কী হে আল্লাহ্র রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যা অভিসম্পাতের কারণ? তিনি উত্তর দেন, জনসাধারণের চলাচলের রাস্তায় এবং ছায়াদানকারী গাছের নিচে যেখানে লোকজন বিশ্রাম গ্রহণ করে ও আশ্রয় নেয়, সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করা। (সহীহ মুসলিম)

১৬.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ্র রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউই বদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করবে না, যে পানি প্রবাহিত হয় না এবং পরে সে পানিতে গোসল করা উচিত নয়। (সহীহ আল বোখারী ও সহীহ মুসলিম)

১৭.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। একদা এক গ্রাম্য লোক মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে আরম্ভ করে। উপস্থিত লোকেরা তাকে বাধা দিতে যায়। ঐ সময় নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লোকটিকে ছেড়ে দাও এবং প্রস্রাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কেননা তোমাদেরকে সহজ করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, কঠোরতা অবলম্বন করার জন্য বানানো হয়নি। (সহীহ আল বোখারী)

প্রস্রাব আটকিয়ে রাখলে মারাত্মক অসুখ সৃষ্টি হতে পারে। সে বিষয়ে চিন্তা করেই নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি জানা থাকলে এরূপ অবস্থায় মসজিদ নাপাককারীর প্রতি আমরা সদয় আচরণ করতে সক্ষম হবো

পায়খানায় প্রবেশের দোয়া :                                       اَللّٰهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُبِكَ مِنَ الْخُبْث ِوَالْخَبَائِثِ.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল খুব্সি ওয়াল খাবাইস।

অর্থ : হে আল্লাহ! নাপাক পুরুষ-জ্বিন ও নাপাক স্ত্রী-জ্বিন (অর্থাৎ সমস্ত শয়তান) থেকে আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি ।

কুলূখ ব্যবহার, ইস্তেঞ্জা ও শৌচকার্য

মল-মূত্র ত্যাগ করলে পাক শুকনা মাটির ঢিলা, পাথর খ-, ছেঁড়া কাপড়, তুলা ও শুকনা কাঠের টুকরা প্রভৃতি দিয়ে কুলূখ নেয়া জায়েয আছে। হাড়, ইট, কয়লা, গোবর, কাগজ, বাসন-কোসন, ভাঙ্গা চাড়া, কাঁচা ঘাস, খাবার বস্তু প্রভৃতি দ্বারা কুলূখ নেয়া নিষেধ। কুলূখের সংখ্যা ও কুলূখ ব্যবহারের কোনো বিধিবদ্ধ নিয়ম নেই। একটি দ্বারা হোক বা একাধিক দ্বারা হোক এবং যেদিক দিয়েই প্রথমে আরম্ভ করা হোক না কেন, গুহ্যদ্বার মুছে পবিত্রতা লাভ করাই কুলূখ নেয়ার একমাত্র উদ্দেশ্যে। তবে মেয়েদের জন্য প্রস্রাবের পর ঢিলা-কুলূখ ব্যবহার করার আবশ্যক হয় না। শহুরে এলাকায় বিশেষ করে যেসব জায়গায় উপরোক্ত কুলূখের উপকরণ সহজলভ্য নয় এরকম স্থানে ঢিলা-কুলূখের বিকল্প টয়লেট পেপার ব্যবহার করা যেতে পারে।

কুলূখ ব্যবহার করার পর প্রচুর পরিমাণ পানি দ্বারা শৌচকার্য সম্পাদন করতে হবে। বাম হাতের দুই বা তিন আঙ্গুলে পেট দ্বারা শৌচকার্য করতে হয়। এ কাজকে ইস্তেঞ্জা বলা হয়। ইস্তেঞ্জা সুন্নতে মুআক্কাদাহ্। তারপর উত্তমরূপে হাত ধুয়ে ডান পা আগে বাড়িয়ে পায়খানা/প্র¯্রাবখানা থেকে বের হয়ে নিম্নলিখিত দু‘আ পাঠ করিতে হবে।

পায়খানা থেকে বের হওয়ার দোয়া:              غُفْرَانَكَ اَ لْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِىْ اَذْهَبَ عَنِّى الْا ٰذ ٰى وَعَافَانِىْ

উচ্চারণ : গুফরানাকা আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আয্হাবা আন্নিল্ আযা ওয়া আ’ফানী।

অর্থ : হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। শোকর সেই আল্লাহর যিনি আমার ভিতর থেকে অপবিত্র কষ্টদায়ক সববস্তু দূর করেছেন এবং আমাকে শান্তি প্রদান করেছেন।

পানির বিবরণ

গোটা পৃথিবীর তিন ভাগের দু’ভাগ পনি আর এক ভাগ হলো স্থল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পানির উপরই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। পানি সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন :

وَاَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَآءِمَاَءً طَهُورًا

উচ্চারণ : ওয়া আনযালনা মিনাস সামাই মাআন ত্বহূরা।

অর্থ : এবং আমি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেছি যার দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা হয়। (সূরা ২৫ ফুরকান : আয়াত ৪৮)

وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُم مِنَ السَّمَاءِمَاءً لِّيُطَهِّرَكُم بِهِ

উচ্চারণ : ওয়াইয়ুনায্যিলু আলাইকুম মিনাস সামাই মাআল্লিইয়ূত্বহহিরাকুম বিহি।

অর্থ : এবং আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্য আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেছেন যাতে এর মাধ্যমে তোমাদেরকে পবিত্র করেন। (সূরা ৮ আনফাল : আয়াত ১১)

হাদীস : রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সমুদ্রের পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা যায়।

বিশুদ্ধ পানির কোনো বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদ নেই। সমুদ্র, নদী খাল-বিল, ঝর্ণা, পুকুর, কূপ, মেঘ, বৃষ্টি ও বরফ ইত্যাদির পানি পাক। তা দিয়ে নাপাকী দূর করা এবং অযু ও গোসলে ব্যবহার করা জায়েয। যে কোনো বদ্ধ পানি বা গর্তের পানি যার পরিধি (দৈর্ঘ্য-প্রস্থ) মিলিয়ে যদি ৪০ (চল্লিশ) হাতের কম হয় তবে অল্প হোক বা অধিক হোক নাপাকী পড়া মাত্র তা নাপাক হয়ে যাবে। ধুলা-বালি বা কাদা মিশ্রিত ঘোলাটে পানি, সাবান বা জাফরান মিশ্রিত ঘোলাটে পানি দ্বারা অযু ও গোসল জায়েয হবে। কিন্তু যদি সাবান ও জাফরানের রঙ স্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয় তবে তা দিয়ে গোসল করা জায়েয হবে না।

মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়াসহ যেসব কীট-পতঙ্গ পানিতে জন্মে অথবা মশা-মাছি প্রভৃতি যাদের দেহে রক্ত হয় না তা পানিতে মরে পঁচে গেলেও পানি নাপাক হবে না। শূকর ও কুকুর ছাড়া মৃত জন্তুর পশম, শিং, হাড়, দাঁত, রগ, ক্ষুর, নখ ও চক্ষু প্রভৃতি যদি চর্বিহীন হয় তবে পাক। এগুলো পানিতে পড়লে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু যদি এগুলোর উপরে বা মধ্যে চর্বি থাকে তবে পানি নাপাক হয়ে যাবে।

-২য় পর্ব পড়ুন-

You may also like