Home ইসলাম শরীয়তের দৃষ্টিতে দাঁড়ি ও গোঁফ রাখার হুকুম

শরীয়তের দৃষ্টিতে দাঁড়ি ও গোঁফ রাখার হুকুম

by admin
০ comment

১.দাঁড়ি

দাঁড়ি হল কারো গাল, থুতনি, ঘাড় এবং ওষ্ঠের ওপরের অংশে গজানো চুল। সাধারণত বয়সন্ধিকালের বা বয়সন্ধিকালোত্তীর্ণ পুরুষলোকের দাঁড়ি গজায়। মুখমন্ডলের ওপরের ও নিচের অংশের চুলের মধ্যে পার্থক্য করতে বলা হলে দাঁড়ি মূলত নিচের অংশের চুলকেই বোঝায়, যার মধ্যে গোঁফ অন্তর্ভুক্ত নয়। দাঁড়ি মুসলিম জাতির স্বকীয়তা, স্বতন্ত্রের বৈশিষ্ট বা আলাদা পরিচিতি বহন করে। যে কোনো ভদ্রলোকই দাঁড়ির মাধ্যমে নিজেকে আবেদনময়ী, স্বাস্থ্যবান ও সুদর্শন করতে পারেন। দাঁড়ি আল্লাহর একটি মহান ও বড় নেয়ামত। ইসলামের চিহ্ন বলে বিবেচিত। দাঁড়ি পৌরুষত্বের পরিচয়, মুসলিমের সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের পূর্ণতার প্রতীক। দাঁড়ি দ্বারা তিনি পুরুষকে অনুগৃহীত করেছেন এবং নারী জাতি থেকে তাকে বৈশিষ্ট্য ম–িত করেছেন। দাঁড়ি রাখা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, দাঁড়ি শুধুমাত্র মুখম–লের উপর কয়েকটি কেশগুচ্ছই নয়; বরং ইহা ইসলামের বাহ্যিক বড় একটি নিদর্শন।

২.দাঁড়ির গুরুত্ব

রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসংখ্য হাদীসে দাঁড়ি রাখার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন, এবং জোরালোভাবে দাঁড়ি লম্বা রাখতে নির্দেশ প্রদান করেছেন। তাই দাঁড়ি রাখা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ ও ওয়াজিব। যা পালন করা প্রত্যেক মুসলমান পুরুষের কর্তব্য। দাঁড়ি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসৃত নীতির একটি অন্যতম পরিচয়। দাঁড়ি ছেড়ে রেখে এবং তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। আল্লাহ্ বলেন : “এগুলো (আল্লাহর নির্দেশাবলি), আর যারাই আল্লাহর নির্দশনাবলির প্রতি সম্মান দেখাবে, সেটা হবে অন্তরের তাকওয়ার প্রকাশ।” (হজ্জ–২২ আতয়াত : ৩২) (হজ্জ : ৩২) কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, দাঁড়ির প্রতি এত গুরুত্ব ও তার প্রতি সম্মানের নির্দেশ থাকা স্বত্বেও অধিকাংশ মুসলমান বিষয়টিকে অতি নগণ্য ও তুচ্ছ মনে করে। যেন ঘৃণা ভরে প্রতিদিন তা মুন্ডন করে ফেলতে মহা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যারা মু–ন করে না তারা আরেক স্টাইলে তার সাথে খেলা–ধুলা করে। কেউ শুধুমাত্র থুতনির উপর ছোট ছোট করে রাখে আবার কেউ খুবই হালকা করে কাল একটি রেখার মত করে রাখে। কেউ আবার দাঁড়িকে গোঁফের সাথে মিলিয়ে দিয়ে গোলাকৃতি করে রাখে। এই চিত্রগুলো দেখলে একদিকে যেমন দুঃখ লাগে অন্য দিকে তা যেন হাস্যেরও পাত্র। যে মুসলমানকে দাঁড়ি ছেড়ে দিতে আদেশ করা হয়েছে, দাঁড়িকে সম্মান করতে বলা হয়েছে সেই মুসলমান তো দূরের কথা কোন বিবেকবানের পক্ষেও এরকম আচরণ করা শোভনীয় নয়। বড়ই পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আল্লাহতায়ালা যে আকৃতিতে দাঁড়িকে সৃষ্টি করেছেন সে অবস্থাতেই তা নিজ মুখম–লে অবশিষ্ট রেখে ইসলামী শিষ্টাচারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারী এরকম সভ্য মানুষের সংখ্যা আজ খুবই বিরল। (লা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ)

৩.দাঁড়ির উপকার

দাঁড়ি রাখলে একজন পুরুষ অনেক স্বাস্থ্যগত সুবিধা পেয়ে থাকেন। পুরুষের দাঁড়ি রাখা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ভালো। দাঁড়ি সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি ঠেকায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত। এটা দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া থেকে পুরুষকে বাঁচায় এবং স্কিন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। দাঁড়ি ধুলোবালি ও ক্ষতিকর বস্তু, রক্ষা করে। নিয়মিত শেইভ করলে আপনার দাঁড়ির মূলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটায় এবং ব্রনের সৃষ্টি করে। পুরুষদের দিনের বেলায় উত্তপ্ত সূর্যের নিচে দাঁড় করিয়ে রাখুন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এবং কে কতটুকু রেডিয়েশান শোষণ করেছে এটা তুলনা করে দেখুন। তখনই দাঁড়ির উপকার আপনার কাছে ধরা পড়বে। দাঁড়ি রাখার স্বাস্থ্যকর দিকগুলো নিম্মে তুলে ধরা হলো–

১. দাঁড়ি আকস্মিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে ঠান্ডা–কাশি প্রতিরোধ করে। বাইরের তাপমাত্রা থেকে ত্বককে বাচাঁতে দাঁড়ি তাপ–নিরোধক হিসেবেও কাজ করে। সেই সাথে শরীরের তাপমাত্রা ধরে রেখে ঠান্ডার সময় মুখ আর গলাকে গরম রাখে।

২. দাঁড়ি অ্যালার্জি থেকে দূরে রাখে পুরুষদের মধ্যে যাদের ধুলো ময়লা এবং রোদে অ্যালার্জি রয়েছে তাদের জন্য দাঁড়ি রাখা অনেক উপকারী। এতে করে মুখের ত্বক সরাসরি ধুলো–বালি এবং রোদের সংস্পর্শে আসে না। সুতরাং অ্যালার্জি সংক্রান্ত সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

৩. দাঁড়ি ত্বকের পরিশোধক হিসেবে কাজ করে। তাই অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী পদার্থ আপনার নাকে–মুখে সহজে ঢ়ুকতে পারেনা। ফলে ত্বকের অ্যালার্জি আর ইনফেকশন তুলনামূলকভাবে কম হয়। তবে অবশ্যই দাঁড়ি নিয়মিত ধুয়ে নিতে হবে।

৪. দাঁড়ি রাখার ফলে ত্বক হয়ে ওঠে আরও মসৃণ আরও তরুণ। দাঁড়ি কাটতে গিয়ে গাল কাটেন নি এমন মহাপুরুষ নেই বল্লেই চলে। তাই গালে কাটা ছেঁড়ার দাগ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর বারবার দাঁড়ি কামানোর কারনে মুখের ত্বকটাও হয়ে যেতে থাকে রুক্ষ। আর তাই দাঁড়ি রাখলে শুধু যে মুখের কাটা ছেঁড়ার দাগটাই যাচ্ছে তা নয়, ত্বকও দেখায় তরুণ প্রকৃতিক ভাবেই।

৫. দাঁড়ি পুরুষের ত্বকের জন্য প্রাকৃতিক মশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে। যারা নিয়মিত দাঁড়ি কামান, ঋতু পরিবর্তনে তাপমাত্রার তারতম্যের প্রভাবে তাদের ত্বক শুষ্ক হয়ে ওঠে। সেইসাথে শেভিং–ক্রিমসহ অন্যান্য প্রসাধনীর ব্যবহারে ত¦কের স্বাভাবিক আদ্রতা হারিয়ে যেতে থাকে। ত্বকের রয়েছে নিজস্ব আদ্রতা ধরে রাখার জন্য মেদবহুল গ্রন্থি। এর থেকে প্রাকৃতিক তেল নিঃসৃত হয়ে ত্বকের আদ্রতা বজায় রাখে। রেজারের বারবার ব্যবহার ত্বকের এই গ্রন্থিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই দাঁড়ি রাখলে তা এই গ্রন্থির কার্যক্রম স¦াভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

৬. দাঁড়ি মুন্ডানের কারনে ত্বক খুব সেনসিটিভ হয়। বারবার দাঁড়ি মুন্ডন করলে ত্বকের সেনসিটিভিটির কারণে সৃষ্টি সমস্যা দাঁড়ি রাখার কারনে দূর হয়।

৭. দাঁড়ি স্কিন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় সরাসরি রোদ ত্বকে লাগা, শেভ করার সময় ও শেভ করার পর নানা ধরণের কেমিক্যাল জাতীয় প্রোডাক্ট ব্যবহার করা ইত্যাদি স্কিন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। তাই পুরুষদের ক্ষেত্রে ডারম্যাটোলজিস্টগণ স্কিন ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে দাঁড়ি রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

৮. দাঁড়ি ব্রণের ঝামেলা থেকে মুক্তি পুরুষের ত্বকেও ব্রণ ওঠে থাকে। শেভ করার প্রোডাক্ট ও ধুলো–বালি এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে তোলে। যারা দাঁড়ি রাখেন তারা নিয়মিত দাঁড়ির যতœ নিলে এই ধরণের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন খুব সহজেই।

৯. দাঁড়ি ত্বকে বয়সের ছাপ ধীরে পড়ে যারা দাঁড়ি রাখেন তাদের ত্বকে বয়সের ছাপ ধীরে পড়ে। ডারম্যাটোলজিস্ট ডঃ অ্যাডাম ফ্রাইডম্যান বলেন,‘মুখের ত্বক দাঁড়ি দিয়ে ঢাকা থাকার ফলে সূর্যের আলোর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হয়। এতে ত্বকের ক্ষতি কম হয়, রিংকেল পড়ে অনেক দেরিতে। সুতরাং ত্বকে বয়সের ছাপ পড়তে দেরি হয়’।

১০.দাঁড়ি অ্যাজমার প্রকোপ কমায় গবেষণায় দেখা যায় দাঁড়ি রাখা নাকে মুখে ক্ষতিকর ধুলো–বালি ঢুকতে বাঁধা প্রদান করে। ফলে ডাস্ট মাইট যার ফলে অ্যাজমার প্রকোপ বৃদ্ধি পায় তা অনেকাংশে কমে আসে। এতে করে অ্যাজমা সংক্রান্ত ঝামেলা থেকেও মুক্ত থাকা সম্ভব হয়।

৪.শরীয়তের দৃষ্টিতে দাঁড়ি ও গোঁফ রাখার হুকুম

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে মুহাব্বত করল সে যেন আমাকেই মুহাব্বত করল। আর যে আমাকে মুহাব্বত করল সে আমার সাথে জান্নাতে বসবাস করবে। (জামে আত তিরমিযী, মেশকাত)

দাঁড়ির বিধানটি শরীয়তের একটি মৌলিক বিধান। একে নিছক আরবীয় রীতি বা বিশেষ স্থান–কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করা মারাত্মক ভ্রান্তি। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফের বাণী সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। আরবীতে ‘ফিতরাত’ শব্দের অর্থ স্বভাব। আল্লাহ রাববুল আলামীন যে উত্তম মারাসূলয় স্বভাব সৃষ্টি করেছেন তার সর্বোত্তম নিদর্শন রাসূল ও রাসূলগণ। এ কারণে ‘ফিতরাত’ শব্দটির অর্থ করা হয়েছে আদর্শ ও অনুকরণীয় স্বভাব, তথা রাসূল ও রাসূলগণের স্বভাব। হাদীস শরীফ থেকে বুঝা যাচ্ছে, মোচ কাটা ও দাঁড়ি রাখাই হচ্ছে পুরুষের স্বাভাবিক অবস্থা এবং সকল রাসূলের সুন্নাহ ও আদর্শ, যাদের অনুসরণের আদেশ কুরআন মজীদে দেয়া হয়েছে। হাদীস থেকে আরো বোঝা যায়, দাঁড়ি মুন্ডানো হচ্ছে একটি বিকৃতি কিন্তু ব্যাপক বিস্তারের কারণে অন্য অনেক বিকৃতির মতো এটাও এখন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে; বরং পুরুষের দাঁড়িমন্ডিত স্বাভাবিক রূপটিই এখন দ্বিধা ও সংকোচের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিকৃতির সূত্র ও আমরা কুরআন মজীদে পাই। কুরআন মজীদে আল্লাহতায়ালা শিরকের বিষয়ে কঠিনভাবে সাবধান করেছেন এবং শিরকে লিপ্তলোকদের সম্পর্কে বলেছেন যে, এরা আসলে শয়তানের (অনুগত ও শয়তানের) কাছে প্রার্থনা করে। এরপর শয়তান যে মানবজাতির চরম শত্রু সে বিষয়ে বান্দাদেরকে সাবধান করেছেন। এ প্রসঙ্গে শয়তানের একটা উদ্ধত ঘোষণাও আল্লাহতায়ালা বান্দাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, আর সে (আল্লাহকে) বলেছিল, আমি তোমার বান্দাদের মধ্য থেকে নির্ধারিত এক অংশকে নিয়ে নেব এবং আমি তাদেরকে সরল পথ হতে নিশ্চিতভাবে বিচ্যুত করব, তাদেরকে অনেক আশা–ভরসা দেব এবং তাদেরকে আদেশ করব, ফলে তারা চতুষ্পদ জন্তুর কান চিরে ফেলবে এবং তাদেরকে আদেশ করব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে বন্ধু বানায়, সে সুস্পষ্ট লোকসানের মধ্যে পড়ে যায়। সে তো তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদেরকে আশা–আকাঙ্খায় লিপ্ত করে। (প্রকৃতপক্ষে) শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়। তাদের সকলের ঠিকানা জাহান্নাম। তারা তা থেকে বাঁচার জন্য পালানোর কোনো পথ পাবে না।

১.পক্ষান্তরে যারা ঈমান আনে এবং আমলে সালেহ করে, আমরা অবশ্যি তাদের দাখিল করবো জান্নাতে, যার নীচে দিয়ে বহমান থাকবে নদনদী নহর। চিরকাল থাকবে তারা সেখানে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, কথার দিকে থেকে আল্লাহর চাইতে সত্যবাদী আরকে (নিসা–৪ আতায়ত : ১২২)

২.আমি অবশ্যি তাদের পথভ্রষ্ট করবো, তাদের মনে মিথ্যা আকাংখা সৃষ্টি করবো, তারা আমার নির্দেশ মতো পশুর কান ছিদ্র করবে এবং আমি তাদের নির্দেশ দিয়ে যাবোই এবং তারা অবশ্যি আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করতে থাকবে যে কেই আল্লাহর পরিবর্তে এই শয়তানকে অলি (বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক) হিসেবে গ্রহণ করবে, যে অবশ্যি নিমজ্জিত হবে সুষ্পষ্ট ক্ষতির মধ্যে। (নিসা–৪ আতয়াত : ১১৯ । আয়াতের এ অংশের আলোচনায় আল্লামা শাববীর আহমদ উসমানী রাহ. বলেছেন, ‘দাঁড়ি মুন্ডানোও এ আকৃতি পরিবর্তনের মধ্যে পড়ে।’ (তাফসীরে উসমানী (মূল) পৃ. ১২৫; (অনুবাদ, ইসলামিকফাউন্ডেশন : ৪৪৬)

হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রাহ. ও আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার প্রসঙ্গে বলেছেন, এটা ফাসেকী কাজ কমের্র অন্তর্ভুক্ত। যেমন দাঁড়ি মুন্ডানো, শরীরে উল্কি আঁকা ইত্যাদি। (তাফসীরে বয়ানুল কুরআন : ১৫৭)

১.উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দশটি বিষয় ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত : মোচ কাটা, দাঁড়ি লম্বা রাখা, মিসওয়াক করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, চামড়ার ভাঁজের জায়গাগুলো ধৌত করা, বগলের নীচের চুল তুলে ফেলা, নাভীর নীচের চুল মুন্ডানো, (বাথ রুমের প্রয়োজন পূরণের পর) পানি দ্বারা পরিছন্নতা অর্জন করা। বর্ণনাকারী বলেন, দশম বিষয়টি আমি ভুলে গেছি, যদি না তা হয় কুলি করা। (সহীহ মুসলিম)

২.ইমাম ইবনে জারীর তবারী রাহ. যায়েদ ইবনে আবী হাবীব রাহ.-এর সূত্রে। আল্লামা ইবনে কাছীরের লিখিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ এর চতুর্থ খন্ডে পারস্যের স¤্রাটের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্র বিনিময় সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক ঘটনার দীর্ঘ বর্ণনা রয়েছে যেখানে উল্লেখ আছে–পারস্য স¤্রাটের পক্ষ থেকে দুইজন দূত রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে আগমন করেন, তারা উভয়ে দাঁড়িমুন্ডানো এবং বড় গোঁফ বিশিষ্ট ছিল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেও প্রতি দৃষ্টিপাত করতে ঘৃনাবোধ করলেন এবং তাদের বললেন, তোমাদের ধ্বংশ অনিবার্য, তোমাদের চেহারা বিকৃত করার হুকুম কে দিল? তারা বলল এটা আমাদের মালিক পারস্য স¤্রাটের হুকুম, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন আমার রব তো আমাকে দাঁড়ি বৃদ্ধি করার এবং গোঁফ ছোট করার হুকুম দিয়েছেন। ঘটনাটি শুধু হাদীসে নয় একটি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা হিসাবে ইসলামের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। (আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪৫৯–৪৬০)

৩.বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবা রাহ. বলেন, জনৈক অগ্নিপূজক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর নিকট এসেছিল। তার দাঁড়ি মুন্ডানো ছিল ও মোচলম্বা ছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘এটা কী?’ সে বলল, ‘এটা আমাদের ধমের্র নিয়ম।’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিন্তু‘ আমাদের দ্বীনের বিধান, আমরা মোচ কাটব ও দাঁড়ি লম্বা রাখব। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৬–১১৭, হাদীস : ২৬০১৩)

দাঁড়ির বিধান যে একটি মৌলিক বিধান তা ঐসব হাদীস থেকেও বোঝা যায়, যেখানে সরাসরি একে আল্লাহর আদেশ বা দ্বীনের অংশ বলা হয়েছে।

৫. দাঁড়ির পরিমাপ

ইসলামী শরীয়তে দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব। দাঁড়ি একমুষ্টি বা চার আংগুল পরিমান লম্বা রাখতে হবে। এক মুষ্টির কম রাখা বা একেবারে তা মুন্ডিয়ে ফেলা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম এবং কবীরা গুনাহ। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর দাঁড়ি রাখা এবং তার অসংখ্য হাদীসে উম্মতের প্রতি দাঁড়ি রাখার সাধারণ নির্দেশই প্রমান করে যে, দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব এবং না রাখা হারাম। ফিক্বাহ শাস্ত্রের একটি মূলনীতি শরীয়ত প্রবর্তক কর্তৃক কোন বিষয়ের প্রতি সাধারন নির্দেশ হলে তা পালন করা ওয়াজিব এবং বিপরীত করা হারাম। এছাড়া সাহাবা, সালফে সালেহীন এবং ফুক্বাহাগণের দাঁড়ি রাখার নিরবছিন্ন আমল এবং তাদের বিভিন্ন উক্তিসমূহের দ্বারাও এক মুষ্টি পরিমাপ লম্বা দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব এবং এর বিপরীত করা হারাম বলেছেন। সুতরাং হাদীস ও সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব।

পৃথিবীর প্রত্যেকটি জাতি বা গোষ্ঠির মধ্যে কিছু স্বাতন্ত্রবোধ বা স্বকীয়তা রয়েছে যা তাদের একান্ত নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধারন করে। যেমন আমেরিকাতে ইহুদীদের চিনতে কোন অসুবিধা হয় না। দাঁড়ি, দুদিকে ছোট বেনী বিশিষ্ট জুলফি, কালো লম্বা পোষাক, মাথার তালুতে ছোট টুপি ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের অন্য জাতি থেকে আলাদা করা যায়। ইহুদীরা তাদের এই স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে কোন প্রকার হীনমন্যতায় ভোগে না। বরং এসবকে তারা তাদের গর্ব ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ধারণ করে। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যমন্ডিত স্বল্প কিছু ইহুদী সমগ্র আমেরিকার অর্থনীতি ও রাজনিতীকে প্রচ্ছন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। ইহুদী লবিকে সমীহ না করে আমেরিকায় কোন সরকার ক্ষমতায় আসতে পারেনা।

ভারতের শিখজাতি সারা পৃথিবীতে তাদের পৃথক বৈশিষ্ট্যর জন্য সুপরিচিত। সকল শিখ তাদের ধর্মগুরু নানকের নির্দেশকে শিরোধার্য করে দাঁড়িমন্ডিত থাকেন এবং বিশেষ এক ধরণের পাগড়ি ব্যাবহার করেন। পাগড়ী ও দাঁড়ি গোঁফের জন্য তারা বিব্রতবোধ করেননা বরং তাদের এসব ধর্মীয় এতিহ্য তাঁরা সর্বাবস্থায় ধারন করেন। যে কারনে খেলার মাঠ থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী পর্যন্ত সকল স্থানে তাদের একই রুপ দৃষ্টিগোচর হয়। ভারতের প্রতিরক্ষা বিভাগ শিখদেরকে সেনাবাহিনীর ক্যাপ ব্যবহার করাতে, কিংবা ক্লিন শেভড থাকতে বাধ্য করতে পারেনি। শিখরা তাদের ধর্মীয় চেতনা ও চিহ্ন সমূহ ধারন করেই গর্বের সাথে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে প্রশংসিত অবদান রেখে যাচ্ছেন। দু:খজনক হলেও সত্য আমরা যারা মুসলমান তারা ইসলামী ঐতিহ্য নিয়ে প্রচন্ড হীনমন্যতায় ভোগী। দাঁড়ি, টুপি, টাখনুর উপর পোষাক পরিধান আমাদের ইসলামী ঐতিহ্যের নিশান বা ”শিয়ার” হলেও আমরা তা পালন করতে দ্বিধাবোধ করি এবং এসব পালনের ব্যাপারে নানা অজুহাতের অবতারনা করি। রাসূল সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে আজমাইন, তাবেয়ী, তাবেতাবেয়ী, আইয়ামে মুজতাহিদীন, চার মাজহাবের সকল ইমাম ও বুযুর্গবৃন্দ, আহলে হাদীস আহলে জাহীরের আলেমসহ বর্তমান যুগের সকল হাক্কানী পীর মাশায়েক ও ওলামাবৃন্দ দাঁড়ি এক মুষ্টির চেয়ে বেশী বা কমপক্ষে একমুষ্টি বা চার আগুল রাখাকে ওয়াজিব কিংবা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা (আবশ্যিক সুন্নাহ) বলেছেন। দাঁড়ি বর্তমান যুগের কোন কোন স্কলারগন গবেষনা ও পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর বর্ধিত ও ঝুলন্ত দাঁড়ি রাখাকে ফরযও বলছেন। সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হোক আর ওয়াজিব হোক মোদ্দা কথা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উম্মত হিসাবে কমপক্ষে এক মুষ্টি বা চার আংগুল বা কিছুটা লম্বা ও ঝুলন্ত দাঁড়ি রাখা একজন মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য কারন এটা মুসলমানের পরিচয় বহন করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সুন্দর সহনীয় লম্বা (কমপক্ষে এক মুষ্টি বা চার আংগুল) এবং ঝুলন্ত দাঁড়ি রাখা যে অবশ্য কর্তব্য বা আবশ্যিক সুন্নাত এটি প্রমাণ করার জন্য ইজমা বা ক্বিয়াসের প্রয়োজন হয় না বরং কুরআন থেকে পরোক্ষভাবে এবং সুন্নাহ থেকে প্রত্যক্ষভাবে আমরা তা জানতে পারি।

দাঁড়ির ব্যাপারে কুরআনেরপ্রত্যক্ষ সমর্থন

১.আল্লাহ বলেছেন, “হে রাসূল আপনি তাদেরকে বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও তবে আমাকে ভালোবাসো আমার অনুসরণ করো, তবেই আল্লাহ তোমাদের ভালো বাসবেন এবং তোমাদের পাপ সমূহ ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল ও পরম দয়াবান।” (ইমরান–২ আয়াত : ৩১)

২.রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ করো,আর যা কিছু নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক। আল্লাহকে ভয় করো নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা (হাশর–৫৯ আয়াত : ৭)

৩.অতএব যারা তাঁর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা যেন তাদের উপর বিপর্যয় নেমে আসা অথবা যন্ত্রনাদায়ক আযাব পৌঁছায়র ভয় করে। (নূর–২৪ আয়াত : ৬৩)

৪.তোমাদের যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির ও শেষ দিনের সাফল্যের আশা করে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে তাদের জন্যে রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (আহযাব–৩৩ আয়াত : ২১)

৪.মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, তিনি মন গড়া কিছুই বলেন না, তাঁর নিকট প্রেরিত ওহীর আলোকেই তিনি কথা বলেন। (নজম–৫৩ আয়াত : ৩–৪)

৫.পবিত্র কুরআনের আল্লাহ বলেন, “যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনুগত্য করল, সে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহরই আনুগত্য করলো। আর যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় আমরা তোমাকে তাদের ওপর রক্ষক নিযুক্ত করিনি।” (নিসা–৪ আয়াত : ৮০)

৬.পবিত্র কুরআনের আল্লাহ বলে, তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের জন্যে কায়েম করো। আল্লাহর ফিতরতের (প্রকৃতির) উপর প্রতিষ্ঠিত হও, যে ফিতরতের উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টি–প্রকৃতির কোনো পরিবর্তন হয়না। এটাই সঠিক সুষম দ্বীন। তবে অধিকাংশ মানুষই জানেনা। (রুম–৩০ আয়াত : ৩০) উল্লিখিত কুরআনেরএ আয়াতে যে “ফিতরতের” উল্লেখ করা হয়েছে তা সহী হাদীসে উল্লিখিত ফিতরতের সাথে অভিন্ন এবং সূক্ষ গোঁফ–দীর্ঘ দাঁড়ি পবিত্র ফিতরতেরই একটি অংশ।

৭.পবিত্র কুরআনের আল্লাহ বলেন,“(শয়তান বলল) আমি অবশ্যি তাদের পথভ্রষ্ট করবো,তাদের মনে মিথ্যা আকংখা সৃষ্টি করবো, তারা আমার নির্দেশ মতো পশুর কান ছিদ্র করবে এবং আমি তাদের নির্দেশ দিয়ে যাবোই এবং তারা অবশ্যি আল্লার সৃষ্টিকে বিকৃতি করতে থাকবে। যে কেউ আল্লাহর পরিবর্তে পরিবর্তে শয়তানকে অলি (বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক) হিসেবে গ্রহণ করবে, যে অবশ্যি নির্মজ্জিত হবে সুষ্পষ্ট ক্ষতির মধ্যে।” (নিসা–৪ আয়াত : ১১৯)

এই আয়াতে “আল্লার সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন” এর ব্যখ্যায় হাকিমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি বয়ানুল কোরাআনে, ‘ফখরুল মুফাসসেরিন’ আল্লামা আব্দুল হক হক্কানী “তাফসীরে হক্কানীতে পাকিস্তানের সাবেক মুফতীয়ে আজম মুফতী শফী তাফসীরে মা’আরেফুল কুরআনের, আল্লামা শিব্বীর আহমদ ওসমানী ফাওয়য়েদে ওছমানীতে, আল্লামা মাহমুদ আলুসী তাফসীরে রুহুল মা’আনীতে এবং শাইখ আলী ছাবুনী আল মুকতাতাফ মিন উয়ুনীত তাফাসীরে যে ব্যখ্যা করেন তার সারমর্ম হচ্ছে–

সৌন্দর্যের জন্য ভ্রু ও চেহারার দাঁড়ি পরিষ্কার করা, শরীরে সূঁচ দিয়ে লেখা বা উল্কি আঁকা, দাঁত ফাঁক করা, দাঁড়ি মুন্ডন করা, এক মুষ্টির নীচে দাঁড়ি ছাঁটা, পুরুষ মহিলার মত এবং মহিলা পুরুষের মত কৃত্রিম আকৃতি ধারন করা ইত্যাদি শয়তানের নির্দেশে। আল্লার সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন এর আওতায় পড়ে। সুতরাং কুরআনেরপরোক্ষ শিক্ষা অনুযায়ী দাঁড়ি কেটে ও ছেঁটে চেহারা বিকৃত করা ও মহিলাদের মত দাঁড়িমুক্ত বেশ ধারন করা শয়তানের কাজ।

পুরুষ ও নারীর মধ্যেকার বাহ্যিক ও প্রকটভাবে দৃশ্যমান পার্থক্য সমূহের মধ্যে চেহারা বা মুখমন্ডলের মধ্যে প্রকৃতিগতভাবে দাঁড়ি থাকা ও না থাকা একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। একজন পুরুষকে যদি কোন কারনে নারীর বেশ ধারন করতে হয় প্রথমেই তাকে দাঁড়ি মুন্ডন করে ফেলতে হবে। সুতরাং দাঁড়ি ফেলে দিলে পুরুষ অবশ্যই নারীর সাদৃশ্য অর্জন করে।

ইসলামী শরিয়তের অনেক বিধান কুরআনের স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই। কুরআনের আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে বলেছেন, “তাদেরকে আমরা পাঠিয়েছিলাম স্পষ্ট প্রমান এবং গ্রন্থাবলি নিয়ে। আর তোমার প্রতি আমরা নাযিল করেছি আয যিকির (আল কুরআন) মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যা তাদের জন্যে সামিল করা হয়েছে এবং তারা যেনো চিন্তা ভাবনা করতে পারে। ” (নাহল–১৬ আয়াত : ৪৪)

পবিত্র কুরআনেরভাষ্য অনুযায়ী সর্ব বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নমুনা হিসাবে গ্রহন করে তাঁকে পুরোপুরি অনুসরন ও অনুকরণ করলেই আমরা আল্লার ভালবাসা পাব এবং আল্লার সন্তুষ্টি অর্জন করে ক্ষনস্থায়ী ধরিত্রী থেকে চীরস্থায়ী স্বর্গে প্রবেশ করতে পারব।

যে কারনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশে ইসলামের বিধান গুলো নিজ মুখে বর্ণনা করে, নিজে প্রত্যক্ষভাবে আমল করে এবং একদল সংশপ্তক সাহাবীদের মাধ্যমে আমল করিয়ে আমাদের সন্মুখে দেদীপ্যমান ও প্রোজ্জল উদাহরন রেখে গেছেন। যেমন কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বলা হয়েছে নামায প্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত আদায় কর কিন্তু কিভাবে নামায পড়তে হবে, কোন কোন সময়ে মোট কত রাকাত নামায পড়তে হবে তার বিশদ বর্ণনা কুরআনের অনুপস্থিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তোমরা আমাকে যেরুপে নামায পড়তে দেখ সেরুপে নামায পড় (সহীহ আল বুখারী)। নামাযের সকল ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত সবই আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছ থেকে অর্থাৎ তাঁর হাদীস বা সুন্নাহ থেকে পেয়েছি। একইভাবে ঈমানের অন্যান্য খুঁটি যেমন সিয়াম, যাকাত ও হজ্ব এর বিষয়ে কুরআনের সংক্ষিপ্ত ভাবে উল্লেখ আছে। এসবের বিস্তারিত নিয়ম নীতি আমরা হাদীস বা সুন্নাহ থেকে পেয়েছি। সুতরাং ঈমানের মূল বিষয়গুলো যদি হাদীস থেকে গ্রহন করে আমরা সন্তুষ্ট থাকতে পারি তবে ইসলামের গুরুত্বপূর্ন অন্যান্য বিষয়ে কেন আমরা সহী হাদীসের উপর আমল করবনা? হাদীস সমূহে দাঁড়ি সম্পর্কীত যা বলা হয়েছে তা মূলত আল্লাহরই নির্দেশ। পবিত্র কুরআনের দাঁড়ির ব্যাপারে আক্ষরিকভাবে নির্দেশমূলক কিছু উল্লেখ না থাকলেও এব্যাপারে প্রায়–প্রত্যক্ষ উদাহরন ও বৌদ্ধিক সমর্থন রয়েছে।

দাঁড়ি প্রসঙ্গে সিহাসিত্তা বা বিশুদ্ধ ছয় হাদীস (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ, জামে আত তিরমিজী, ইবনে মাজা, সুনানে নাসায়ী) ও সিহাসিত্তার বাহিরেও অনেক বিশুদ্ধ হাদীস, সকল মাযহাব ও আহলে হাদীসের ওলামা–গবেষকবৃন্দ, সর্বজনগ্রাহ্য সন্দেহাতীত মতামত উল্লেখ করা হলো।

সুন্নাহ বা বিশুদ্ধ হাদীসের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা

সহীহ হাদীসে যে সব জায়গায় দাঁড়ি রাখার বা বৃদ্ধি করার বা ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ এসেছে সব খানে বিধর্মীদের বিরোধীতার কথা আসেনি। বরং সহীহ হাদীসে দীর্ঘ দাঁড়ি রাখাকে পবিত্র ফিতরাতের অর্ন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ দাঁড়িধারনকে আমার রবের নির্দেশ, আমার ধর্ম বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাঁড়ি মুন্ডানো লোকদের ঘৃনার দৃষ্টিতে দেখেছেন। সবচেয়ে বড় কথা এক জন বড় মাপের নেতার বা ধর্মপ্রচারকের নির্দেশ সমূহের মধ্যে কোনটি অধিক বা কোনটি কম গুরুত্বপূর্ন তা সবচেয়ে বেশী উপলব্ধি করতে পারেন তাঁর সবচেয়ে কাছের এবং সবচেয়ে ত্যাগী অনুসারীরা হাজার বছর পরের কোন অনুগামীর পক্ষে তা অনুধাবন অবশ্যই দুষ্কর। সে হিসাবে সাহাবীদের, তৎপরবর্তী তাবেয়ীদের ও তাবে–তাবেয়ীদের আমল থেকেই স্পষ্ট বুঝা যায় দাঁড়ির ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত বেশী সতর্ক ও আন্তরিক ছিলেন : তাঁদেরকে বা তাদের অনুসারী কোন মুসলমান আলেম বা শাইখকে আজ পর্যন্ত দাঁড়িহীন পাওয়া যায়নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ি রাখার ব্যপারে সারাজীবন একই ভূমিকা পালন করেছেন–নিজেও রেখেছেন এবং সাহাবীদেরকেও রাখিয়েছেন এর বিপরীতে তাঁর কোন আমল বা ভাষ্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না।

১.হযরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন– রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তোমরা গোঁফ একবারে কেটে ফেল এবং দাঁড়ি লম্বা কর। (সহীহ আল বোখারী : ২৭৪২)

২.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোঁচ কাটার ও দাঁড়ি লম্বা করার আদেশ করেছেন।’ (সহীহ মুসলিম : ১২৯)

৩.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–তোমরা গোঁফ ছোট রাখ এবং দাঁড়িকে বড় হতে দাও। (সহীহ মুসলিম শরীফ : ২৪৭)

৪.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–মুশরিকরা যা করে তোমরা তার উল্টা করো। গোঁফ কেটে ফেলো এবং দাঁড়ি বড় কর। (সহীহ মুসলিম : ২৪৮)

৫.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মুশরিকদের বিরোধিতরা কর, দাঁড়ি লম্বা কর, আর গোঁফ ছোট কর। (সহীহ আল বুখারী : ৮৭৫, মুসলিম)

৬.হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন দশটি কাজ প্রকৃতি বা ফিতরাতের অন্তর্ভূক্ত “গোঁফ খাট করা, দাঁড়ি বড় করা, মিসওয়াক করা, নাকে পানি দেয়া, নখ কাটা, আগুলের গিরাগুলো ঘসে মেজে ধোয়া, বগলের পশম উপড়িয়ে ফেলা, নাভীর নিচের অবাঞ্চিত লোম মুড়িয়ে ফেলা এবং মলমূত্র ত্যাগের পর পানি ব্যবহার করা।” (সহীহ মুসলিম : ২৪৯)

৭.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন তোমরা গোঁফ খাট করো এবং দাঁড়ি লম্বা কর। (জামে আত তিরমিযি : ২৭০০)

৮.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন আমাদের রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোঁফ খাট করতে এবং দাঁড়ি লম্বা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। (জামে আত তিরমিজি : ২৭০১)

৯.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন তোমরা গোঁফ ছোট করো এবং দাঁড়ি বাড়াও। ইমাম আবু জাফর ইবনে মুহাম্মদ আল মিসরী আত তাহাবী প্রনীত” তাহাবী শরীফ ” নামক হাদীস সংকলনটি সমগ্র মুসলিম জাহানে একটি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ হিসাবে যথেষ্ট গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে। (সুনানে নাসায়ী : ৪১৫৩)

১০.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোঁফ ছাঁটতে ও দাঁড়ি লম্বা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। (আবু দাউদ : ৪১৫৩)

১১.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের গোঁফ ছাটতেন অথবা বলেছেন তা ছাটাতেন। আল্লার বন্ধু ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও এটা করতেন। (জামে আত তিরমিজী, মিশকাত : ৪২৪০)

১২.হযরত যায়েদ ইবনে আকরাম রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে ব্যক্তি গোঁফ ছাঁটেনা সে আমাদের মধ্যে নেই। (জামে আত তিরমিজী, সুনানে নাসায়ী ও মুসনাদে আহমাদ, মিশকাত : ৪২৪১)

১৩.হযরত ইউনুস ও হযরত মুহাম্মদ ইবনে আমের ইবনে ইউনুস তাদের নিজ নিজ সূত্রে নাফে হতে, তিনি তার পিতা হতে এবং ইবনে ওমর হতে, আর উভয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, তোমরা গোঁফ গোড়া হতে চেছে ফেল এবং দাঁড়ি বৃদ্ধি কর। (তাহাবী : ৬০৮৭)

১৪.ইয়াজীদ ইবনে সিনান হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে একই বর্ণনা করেন এবং তিনি অতিরিক্ত এক কথা বর্ণনা করেন যে, তোমরা ইয়াহুদীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করোনা। (তাহাবী : ৬০৮৭)

১৫.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–তোমরা দাঁড়ি ছেড়ে দাও অথবা তিনি বলেন তোমরা দাঁড়ি লম্বা কর। (তাহাবী : ৬০৯০)

১৬.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা গোঁফ কাট এবং দাঁড়ি লম্বা কর, আর অগ্নিপূজকদের বিরোধিতা কর। (মুসলিম : ১২৯)

১৭.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দাঁড়ি বাড়াও, গোঁফ কাট এবং এ ক্ষেত্রে ইহুদী–খ্রীষ্টানদের সাদৃশ্য অবলম্বন করোনা। (মুসনাদে আহমদ)

২০.হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নীত আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–দাঁড়ি বাড়াও গোঁফ কাট এবং এই ক্ষেত্রে ইহুদী খৃস্টানদের সাদৃশ্য অবলম্বন করো না। (মুসনাদে আহমদ, ইবনে হাম্বল)

২১.হযরত আবু সালমা হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন–তিনি বলেন তোমরা গোঁফ গোড়া হতে চেঁছে ফেল এবং দাঁড়ি লম্বা কর। (তাহাবী : ৬০৯১)

উপরের হাদীসগুলো থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লম্বা ও পূর্ণ দাঁড়ি রাখার আদেশ করেছেন। সুতরাং এভাবেই দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাঁড়ি

রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমল দ্বারাও দাঁড়ির প্রমান পাওয়া যায়। রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়ি যে দীর্ঘ ঘন ও সুন্দর ছিল এব্যাপারে অন্যান্য সহী হাদীস গ্রন্থ সমূহে প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবীদের অনেক বর্ণনা রয়েছে।

১.হযরত খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কেউ জিজ্ঞেস করেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি জোহর ও আছর নামাযে কেরাআত পাঠ করতেন? তিনি বলেন, হ্যা, পাঠ করতেন। লোকটি পুন: প্রশ্ন করেন, আপনি কিভাবে তা বুঝতেন? তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর দাঁড়ি মুবারকের দোলায় আমরা বুঝতাম যে, তিনি কিরআত পাঠ করছেন। (তাহাবী) বলাবাহুল্য, কেরাআত পাঠকালে ঐ দাঁড়ি দোলাই পরিদৃষ্ট হবে, যা যথেষ্ট দীর্ঘ হয়, ছোট ছোট দাঁড়ি কখনো দুলবে না।

২.হযরত খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন যোহর ও আছর নামাযে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়ির নড়াচড়া ও দোলার দ্বারা তাঁরা বুঝতে পারতেন যে তিনি চুপি চুপি কুরআন পড়ছেন। দাঁড়ি যথেষ্ট লম্বা না হলে নামাযের মধ্যে পিছন থেকে দাঁড়ির নড়চড়া দৃষ্টিগোচর হওয়া সম্ভব নয়। (আবু দাউদ)

৩.হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং ওসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্নিত হাদীস অনুযায়ী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ি এই নিয়মে খিলাল করতেন যে তিনি দাঁড়ির নিচের দিক হতে হাতের আগুল প্রবেশ করিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতেন। (জামে আত তিরমিজী) আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ শরীফের হাদীসেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়ি খিলালের বর্ণনা রয়েছে। দীর্ঘ দাঁড়িতেই এভাবে খিলাল করার প্রয়োজন হয়।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর চেহারা মোবারক ছিল ঘন দাঁড়িমন্ডিত। তাঁর দাঁড়ি ছিল বুকের এক পার্শ্ব থেকে অন্য পার্শ্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু সাহাবীদের দাঁড়ি বৃদ্ধি করার নির্দেশ দেন নি তিনি নিজেও যে দীর্ঘ ঝুলন্ত সুন্দর দাঁড়িধারী ছিলেন তা সিহাহ সিত্তার হাদীস থেকে প্রমানিত।

সুতরাং দেশী বা বিদেশী কোনো ব্যক্তি বা শ্রেণীর অনুকরণের পরিবর্তে আমাদের কর্তব্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর অনুকরণ করা। কারণ আমরা তো তাঁরই উম্মত। তিনিই আমাদের অনুকরণীয়।

দাঁড়ি ও সাহাবায় কেরামের আমল

১.পবিত্র কুরআনেরআল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বলেন “মুহাজির ও আনসার সাহাবাগনের মধ্যে যারা (ঈমানের দাওয়াত গ্রহণে) প্রথম ও অগ্রগামী নিষ্ঠার সাথে তাদেও অনুসরণ করছে তাদের সবার প্রতি আল্লাহ রাজি হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি রাজি। তিনি তাদেও জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন জান্নাত, যার নীচ দিয়ে বহমান রয়েছে নদ–নদী–নহর। চিরকাল থাকবে তারা সেখানে। এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। (তাওবা–৯ আয়াত : ১০০)

২.আল্লাহ বলেন “কারো কাছে হিদায়েত (সত্যপথ) সুস্পষ্ট হবার পরও যদি সে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনের পথ ছাড়া অন্য পথ অবলম্বন করে, তাহলে সে যেদিকে মুখ ফিরিয়েছে আমরা তাকে সে দিকেই ফিরিয়ে দেবো এবং তাকে প্রবেশ করাবো জাহান্নামে, যা চরম নিকৃষ্ট আবাস। (নিসা–৪ আয়াত : ১১৫)

১.রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন ”বনী ই¯্রাইল বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মাত তিহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। কিন্তু‘ সব দলই জাহান্নামী। শুধু এক দলই জান্নাতী। সাহাবাগন জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ, ঐ জান্নাতী দল কোনটি ? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন–যারা আমার ও আমার সাহাবাদের পথে সুপ্রতিষ্ঠিত ও অবিচল থাকবে (আবু দাউদ)।

২.রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন “যে ব্যক্তি আমার পরে জীবিত থাকবে সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের জন্য জরুরী হলো তোমরা আমার সুন্নাত ও আমার হেদায়েত প্রাপ্ত চার খলীফার সুন্নাতকে মজবুত করে ধরবে (ইবনে মাজাহ)।

সুতরাং পবিত্র কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস অনুযায়ী বিরুপ সময়ে বিতর্কীত বিষয়ে সমাধানের জন্য সাহবীদের অনুসরন করাও আমাদের জন্য জরুরী।

৪.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন– তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতায় দাঁড়ি লম্বা রাখ এবং গোঁফ কেটে ফেল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন হজ্ব কিংবা ওমরা করতেন তখন দাঁড়ি মুঠো করে ধরতেন এবং মুঠোর বাহিরের যা বেশী হত তা কেটে ফেলতেন। (সহীহ আল বোখারী : ২৭৪৩)

৫.হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন” আমরা হজ্ব ও ওমরা ছাড়া সবসময় দাঁড়ি লম্বা রাখতাম।” (আবু দাউদ : ৪১৫৫)

৬.খলীফা হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বড় দাঁড়ি বিশিষ্ট ছিলেন, জালালুদ্দিন সুয়ুতি ”তারিখুল খুলাফা” গ্রন্থে লিখেন–হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু অনেক বড় দাঁড়ি বিশিষ্ট ছিলেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানীর প্রামান্য গ্রন্থ আল ইছাবা তে আছে–এভাবে বিভিন্ন প্রামান্য গ্রন্থে খুলাফায়ে রাশেদীনসহ সকল অনুসরণীয় জলিলুল কদর সাহাবীদের যে বর্ধিত–ঝুলন্ত সুন্দর মানানসই দাঁড়ি ছিল এব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। সাহাবীদের সেই আমলও সুন্নাহ’র অন্তর্ভুক্ত যাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মতি ছিল বা যা দেখে তিনি নিষেধ করেন নি।

দাঁড়ির ব্যাপারে চার মাজহাবের চূড়ান্ত দৃষ্টিভঙ্গি

হানাফী মাযহাব :

১.হানাফী মাজহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘দুররে মুখতারে’ (২য় খ-/৪৫৯ পৃঃ) বলা হয়েছে : পুরুষের জন্য দাঁড়ি কর্তন করা হারাম। নিহায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, দাঁড়ি এক মুষ্টির বেশী হলে তা কেটে ফেলা ওয়াজিব। কিন্তু এর চাইতে বেশী কর্তন করা যেমনটি পশ্চিমা দেশের লোকেরা এবং খোঁজা পুরুষেরা করে তা কেউ বৈধ বলেননি। আর দাঁড়ি সম্পূর্ণটাই কেটে চেঁছে ফেলা হিন্দুস্থানের ইহুদী ও কাফের–মুশরেকদের কাজ।”

২.হানাফী মাযহাবের মশহুর ফকীহ ইবনুল হুমাম বলেন “এক মুষ্টির ভিতর দাঁড়ি কর্তন করা কারো মতেই বৈধ নয়।”

৩.হানাফী মাযহাবের কিতাব ‘শরহে মুনহাল’ ও ‘শরহে মানজুমাতুর আদবের’ মধ্যে লিখেছেন, নির্ভরযোগ্য ফতোয়া হল দাঁড়ি মুন্ডানো হারাম।

মালিকী মাযহাব :

১.মালেকী মাজহাব মতেও দাঁড়ি মুন্ডন করা হারাম। অনুরূপভাবে ছুরত বিগড়ে যাওয়া মত ছেটে ফেলাও হারাম। (কিতাবুল ওবদা)

২.মালিকী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ ইমাম আবুল আব্বাস কুরতুবী মালিকী মুসলিমের ব্যাখ্যা গ্রন্থ “আল–মুফহিম” এ লিখেন–দাঁড়ি মুন্ডানো ও উপড়ানো কোনটাই বৈধ নয়।

৩.মালিকী মাজহাব মতে দাঁড়ি কাটা হারাম। (আল আদাভী আলা শারহে কিফায়াতুত্ তালেব রাব্বানী ৮ম খ– ৮৯ পৃঃ)

হাম্বলী মাযহাব :

১.হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ইমাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী বলেন–দাঁড়ি মুন্ডন করা হারাম।

২.হাম্বলী মাজহাবের বিদ্বানগণও দাঁড়ি মু–নকে হারাম বলেছেন। (ইনসাফ, শরহে মুন্তাহা) অতএব দাঁড়ি মু–ন করা বড় পাপ। এ থেকে তওবা করা আবশ্যক।

৩.হাম্বলী মাজহাবের কিতাব “শাহহুল মুন্তাহা” ও “শরহে মুজ্জুমাতুল আদব” এর উল্লেখ হয়েছে যে, নির্ভরযোগ্য মত হল দাঁড়ি মুন্ডন করা হারাম।

৪.ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) নিজ রচিত “কিতাবুজ্জুহুদে” আকীল ইবনে মোদরেক সালামী হতে উদ্ধৃতি করেন যে, আল্লাহ জাল্লা শানুহু বনী ই¯্রাইলের এক রাসূলর নিকট এই অহী প্রেরন করেন যে, তিনি যেন নিজ কওম বনী ই¯্রাইলকে এ কথা জানিয়ে দেন যে, তারা যেন আল্লাহতায়ালার দুশমনদের বিশেষ খাদ্য শুকরের গোশত না খায় এবং তাদের বিশেষ পানীয় অর্থাৎ শরাব (মদ) পান না করে এবং তাদের দাঁড়ি ছুরত (আকৃতি) না বানায়। যদি তারা এমন করে অর্থাৎ শুকরের গোশত খায়, বা মদ পান করে, অথবা দাঁড়ি মুন্ডায় বা ছোট করে (ফ্রেন্সকাট করে) অথবা বড় বড় মোচ রাখে, তাহলে তারাও আমার দুশমন হবে, যেমন তারা আমার দুশমন। (দালায়েলুল আসর) কওমে লূতের নিন্দনীয় বৈশিষ্ট্য ও ধ্বংসের কারন : প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে আসাকেরসহ আরো কতিপয় মুহাদ্দিস হযরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই মুবারক হাদীস বর্ণনা করেন যে, দশ প্রকার পাপে লূত সম্প্রদায় ধ্বংস হয়েছিল; তন্মধ্যে দাঁড়ি কাটা, গোঁফ বড় রাখা অন্যতম।

শাফেয়ী মাজহাব :

১.ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) তাঁর প্রখ্যাত গ্রন্থ “আল উম্ম” উল্লেখ করেছেন যে, দাঁড়ি কর্তন করা হারাম।

২.শাফেয়ী মাজহাবের আলেম আযরাঈ বলেন : সঠিক কথা হচ্ছে কোন কারণ ছাড়া সম্পূর্ণ দাঁড়ি মু–ন করা হারাম। (হাওয়াশী শারওয়ানী ৯ম খ– ৩৭৬ পৃঃ)

৩.শাফেয়ী মাজহাবের প্রখ্যাত আলেম ইবনুর রিফায়া শাফিয়ী তার বিখ্যাত রচনা ‘আলকিফায়াতু ফি শারহিত তানাবিয়াহ’তে লিখেন–ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁর “আল–উম্ম” পুস্তকে দাঁড়ি মুন্ডনকে হারাম বলেছেন।”

আলেম ও আধুনিক গবেষকবৃন্দের মতামত

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বেশ কিছু ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ এবং মুক্তমনের গবেষক কুরআন ও হাদীসের আলোকে জীবন যাপনের ব্যপারে মুসলমানদের উৎসাহিত করেছেন। এ ধারায় বিশিষ্ট ফকিহ–আলেম এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত গবেষকবৃন্দও রয়েছেন। এদের মধ্যে–ইমাম আল্লামা ইবনে হাযম যাহিরী, আল্লামা আহমদ বিন আবদুর রহমান আল বান্না, মুহাদ্দিস শাইখ নাছিরউদ্দিন আলবানী, সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি আব্দুল আজিজ বিন বায, ডা. জাকির আব্দুল করিম নায়েক উল্লেখযোগ্য।

১.ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, দাঁড়ি মু–ন, উঠানো বা কর্তন করা কোনটাই জায়েজ নয়।

২.শায়খ বিন বায (রহ.) বলেন, দাঁড়িকে সংরক্ষণ করা, পরিপূর্ণ রাখা ও তা ছেড়ে দেয়া ফরয। এই ফরযের প্রতি অবহেলা করা জায়েজ নয়।

৩.শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন, দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব, উহা মু–ন করা হারাম বা কবীরা গুনাহ।

প্রসিদ্ধ চার মাজহাবের ফিকাহ বিদগণও দাঁড়ি ছেড়ে দেয়া ওয়াজিব ও কেটে ফেলাকে হারাম বলে মত প্রকাশ করেছেন।

৪.ইবনে হাযম দাঁড়ি মুন্ডানো (শেভ করা) কে মুছালা (বিকৃতি) ও হারাম বলেছেন।

৫.আব্দুর রহমান আল বান্না তার প্রসিদ্ধ “আল–ফাতহুর রব্বানী” গ্রন্থে লিখেন–দাঁড়ি মুন্ডানো (শেভ করা) হারাম।

৬.আল বানী তার “আদাবুয যুফাফ” গ্রন্থে দাঁড়ি মুন্ডানো (শেভ করা) হারাম হওয়ার উপর চারটি দলিল উল্লেখ করে বলেন এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই যে দাঁড়ি বৃদ্ধি করা ওয়াজিব এবং দাঁড়ি মুন্ডান (শেভ করা) করা হারাম।

৭.সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি আব্দুল আজিজ বিন বায বলেন–দাঁড়ি সংক্রান্ত হাদীস সমূহের আলোকে একথা প্রতিয়মান হয় যে দাঁড়ি লম্বা করা ও ছেড়ে দেয়া ওয়াজিব এবং মুন্ডানো (শেভ করা) ও ছোট করা হারাম হওয়ার দাবী রাখে।

৮.ডা.জাকির নায়েক বলেন, শেখ নাসির আলবানী এক মুঠের নীচের দাঁড়ি কেটে ফেলতে বলেছেন অন্যথায় অতিরিক্ত লম্বা দাঁড়ি রাখা মাকরুহ হবে। এটা অনেক শক্তিশালী ফতোয়া এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে এই মতের সাথে একমত।

৯.বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন হাকীমুল উম্মত বা উম্মতের চিকিৎসক মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ” ইসলাহুর রুসুম” গ্রন্থে লিখেছেন যে সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে উল্লেখ রয়েছে-“আ’ফুল লূহা ওয়া আহ্ফুস্ শাওয়ায়েব” যার অর্থ তোমরা দাঁড়ি বড় কর ও মোচ ছোট কর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুকুম করেছেন ছিগায়ে আমর দ্বারা অর্থাৎ হুকুমবাচক ক্রিয়াপদ দ্বারা। আর ’আমর’ (আদেশ) হাকীকাতান (মূলত) ওয়াজিবের জন্য ব্যবহার হয়।

১০.মাওলানা আশেকে এলাহী মিরাঠী (রহ.) তার প্রণীত “দাঁড়ি কী কদর ও কীমত” কিতাবে দাঁড়ি কাটা হারাম বলেছেন।

অনুরূপ অন্যান্য গ্রন্থাকারও দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে মাননীয় ইমামদের ইজমা (ঐক্যমত) বর্ণনা করেছেন। দাঁড়ি কর্তনকারী আল্লাহ পাকের দুশমনদের মধ্যে গণ্য হওয়ার সম্ভাবনা।

আমাদের স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্রবোধের গুরুত্ব

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে মুসলিমবৃন্দ তোমরা দাঁড়ি রাখ এ কথা বলেন নি কারন কোন মুসলমান তাঁর পবিত্র সুন্নাত চেঁছে ফেলে দিবে তিনি তা কল্পনাই করেন নি। শুধু তাই নয় সে যুগে আরবে অগ্নিপূজক ব্যাতীত মুশরিক, ইয়াহুদী–নাছারা প্রায় সকলেই বিভিন্ন স্টাইলে ছোট দাঁড়ি ও বড় গোঁফ রাখতেন। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাদৃশ্য থেকে বেঁচে থাকার জন্য বেশীর ভাগ জায়গায় বলেছেন দাঁড়িকে বৃদ্ধি কর, কোথাও বলেছেন দাঁড়িকে ছেড়ে দাও বা বড় হতে দাও এবং প্রত্যেক জায়গায় মোচকে ছোট বা চেঁছে ফেলতে বলেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নির্দেশ বা উপদেশটি ছিল মূলত বিশেষ একটি দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে এবং সেটি হচ্ছে মুসলিম জাতির স্বকীয়তা, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট বা আলাদা পরিচিতিকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা। শুধু দাঁড়ি–গোঁফ রাখার পদ্ধতিতে নয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎকালীন মুশরিক ইহুদী খৃষ্টানদের বিরোধীতা বা তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন না করার জন্য সাহাবীদের অন্যান্য আরো অনেক বিষয়েও পরামর্শ দিয়ে গেছেন। বিশুদ্ধ ছয় হাদীস গ্রন্থ (সিহা সিত্তাহ) সমূহে এ ব্যাপারে অনেক হাদীসের উল্লেখ রয়েছে যেমন–তিনি সাহাবীদের বলেছেন–

ক. মহররমে ইহুদীরা একটি রোজা রাখে, তোমরা তাদের বিরোধীতা করে দুইটি রোজা রাখ।

খ. রোজাতে ইয়াহুদিরা সেহরী খায়না তোমরা সেহরী খেয়ে তাদের বিপরীত করো।

গ. অহংকারী মুশরিকদের মত তোমরা টাখনু গীরার নীচে কাপড় পরোনা।

ঘ. ইয়াহুদীরা দাঁড়িতে রঙ্গীন খেজাব লাগায় না তোমরা রঙ্গীন খেজাব কিংবা মেহেদী লাগাও।

ঙ. ইয়াহুদীরা জুতা–মৌজা খুলে নামায পড়ে তোমরা জুতা–মৌজা পরিহিত অবস্থায় নামায পড়।

চ. মুশরীকরা টুপি ছাড়া পাগড়ী পরে তোমরা টুপি দিয়ে পাগড়ী পরে তাদের বৈসাদৃশ্য হও ইত্যাদি। একইভাবে মূর্তিপূজক, অগ্নিপূজারী ও ইহুদী–খ্রীস্টানদের থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্টমন্ডিত হয়ে মহিমান্বিত হওয়ার জন্যেই মহান আল্লার নির্দেশেই আল্লার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িকে লম্বা করতে বা বাড়াতে এবং গোঁফকে ছোট করতে বা চেঁছে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়ার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরন করবে সে ব্যক্তি সে জাতির মধ্যে গন্য হবে (আবু দাউদ)।

ছ.রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–আল্লার নিকট তিন শ্রেণীর লোক সবচেয়ে বেশী ঘৃনিত –

১. ১ম শ্রেণী হচ্ছে যারা হারাম শরীফের মধ্যে কুফরী কার্যকলাপ করে।

২. ২য় শ্রেণী হচ্ছে যারা ইসলামে থাকা অবস্থায় (মুসলমান হয়েও) জাহিলিয়্যাতের রীতি–নীতি ও আদর্শ (কাফের মুশরিকদের অনুকরন–অনুসরন) পালন করে।

৩. ৩য় শ্রেণী হচ্ছে যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো রক্ত প্রবাহিত করে। (সহীহ আল বুখারী : ৬৩৭৪)

পবিত্র কুরআনেরস্বয়ং আল্লাহ বিশ্বাসীদের লক্ষ্য করে বলেন, “যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর যিকির এবং তিনি যে মহাসত্য (আল কুরআন) নাযিল করেছেন তার পাঠে তাদের হৃদয় বিগলিত হবার সময় কি এখনো হয়নি? ইত্যেপূর্বে যাদেও কিতাব দেয় হয়েছিল, এরা যেনো তাদেও মতো নয় না হয়। (তাদের অবস্থা এমন হয়েছিল যে,) একটা দীর্ঘসময় অতিবাহিত হবার পর তাদেও অন্তর কঠিন হয়ে পড়েছিল এবং তাদের অনেকেই হয়ে পড়েছিল ফাসিক।” (হাদীদ–৫৭ আয়াত : ১৬)

প্রাতিষ্ঠানিক ও সমন্বিত মতামত

ভারতের দারুল উলুম দেওবান্দের অনুসারী আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার ইসলামি আইন ও গবেষণা বিভাগ (ইফতা বিভাগ) কতৃক প্রণীত ফতোয়া সর্বশ্রেনীর আলেমদের নিকট স্বীকৃত ও গ্রহনযোগ্য।

১.আল্লামা আহমদ শফী সাহেব বলেন “শরীয়তের দৃষ্টিতে এক মুষ্ঠি পরিমাণ লম্বা দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব তথা অত্যাবশ্যকীয়। এক মুষ্ঠি থেকে কম রাখা বা ছাটা বা সেভ করা হারাম। উক্ত সিদ্ধান্ত সকল ফোকাহায়ে কেরাম একমত।”

২.আধুনিক ভাবধারায় অনুপ্রানীত বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেম, কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের শরীয়া বোর্ডের সদস্য বিশিষ্ট ইসলামী লিখক মাওলানা মুহিউদ্দিন খান বলেন “দাঁড়ি এক মুষ্টি পরিমাণ রাখা ওয়াজিব।”

৩.মরহুম পীর মাওলানা আব্দুল জব্বার (রহ.) বলেন “দাঁড়ি রাখা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের প্রতি দাঁড়ি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন দাঁড়ি রাখ এবং গোঁফ খাট করো। (সহীহ আল বোখারী)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পরিমাণ দাঁড়ি রেখেছেন সাহাবীগণের সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আলেম, পীর, ওলী, দরবেশ নির্বিশেষে সর্বশ্রেণীর দ্বীনদার লোকজন দাঁড়ির সেই পরিমাণ বিনা দ্বিধায় অনুসরণ করে এসেছেন। সুতরাং এই ব্যাপারে ভিন্নমত প্রকাশ করার কোনো অবকাশ নেই।

সকল ধর্ম প্রচারক ও আধ্যাত্বিক পুরুষরাই ছিলেন দাঁড়িমন্ডিত

পবিত্র কুরআনের আল্লাহ বলেন, তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের জন্যে কায়েম করো। আল্লাহর ফিতরতের (প্রকৃতির) উপর প্রতিষ্ঠিত হও, যে ফিতরতের উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টি–প্রকৃতির কোনো পরিবর্তন হয়না। এটাই সঠিক সুষম দ্বীন। তবে অধিকাংশ মানুষই জানেনা। (রুম–৩০ আয়াত : ৩০)

সিহা সিত্তার হাদীস সমূহে যে ফিতরাতের (দশটি বিষয়) উল্লেখ আছে সে বিষয়গুলোর সমষ্টি হচ্ছে সুস্থ প্রকৃতি তথা আধ্যত্বিক ব্যক্তিত্বের স্বভাবজাত ব্যাপার। অধিকাংশ হাদীসবিশারদ ও গবেষকদের মতে ফিতরাত মূলত সকল রাসূল ও আধ্যাত্বিক পবিত্র পুরুষদের তরীকা। সে হিসাবে বোঝা যায় দুটি গুরুত্বপূর্ন ফিতরাত গোঁফ সূক্ষ করা ও দাঁড়ি দীর্ঘ করা সকল রাসূল বা ধর্ম প্রচারকদের সুন্নাত ছিল।

পবিত্র কুরআনের রাসূলদের দাঁড়ি সম্পর্কিত একটি তথ্য পাওয়া যায়; পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে যে, বনি ইসরাইল গরুর বাছুর পূজার ঘটনায় হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ভয়ঙ্কর রাগান্বিত হয়ে আপন ভাই হযরত হারুণ আলাইহিস সালাম এর দাঁড়ি ও মাথার চুল হাতে নিলে হারুণ আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, “হে আমার মায়ের পেটের ভাই ভাই? তুমি আমার দাঁড়ি এবং চুল ধরোনা। আমি আশংকা করেছিলাম, তুমি বলবে : তুমি বনি ইসরাঈলে মধ্যে বিভত্তি সৃষ্টি করেছো এবং আমার কথা রক্ষা করোনি।(তোয়াহা–২০ আয়াত : ৯৪) অথচ হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন হারুন আলাইহিস সালাম এর দাঁড়ি হাত দিয়ে ধরে টান দিলেন (যা সূরা আরাফেও বর্ণিত আছে) তাতে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত হারুণ আলাইহিস সালাম এর দাঁড়ি যথেষ্ট লম্বা ছিল।

ইমাম বায়হাকীকৃত একটি গ্রহনযোগ্য হাদীস সংকলন “দালায়িলুন নুবুওয়াহ” গ্রন্থের একটি সহীহ হাদীসে রাসূল হযরত নুহ আলাইহিস সালাম, হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম, হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম, এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এর দাঁড়ি থাকার উল্লেখ আছে।

পবিত্র কুরআনেরভাষ্য অনুযায়ী পৃথিবীর এমন কোন জাতি বা গোষ্ঠি নাই যাদের নিকট আল্লাহ রাসূল বা সতর্ককারী প্রেরণ করেন নাই।

বর্তমানে পৃথিবীতে যে ধর্ম গুলোর উল্লেখযোগ্য অনুসারী রয়েছে তার মধ্যে প্রথমে রয়েছে খ্রীস্টান ৩১.৫%, মুসলিম ২৩.২%, ধর্মহীন বা মানবধর্ম ১৬.৩%, হিন্দু ১৫%, বৌদ্ধ৭.১%, চায়নার ধর্ম সমূহ (কনফুসিয়াসিজম, টো–ইজম) ৫.৯% , ইয়াহুদী, শিখ, আফ্রিকার প্রকৃতি পুজারী সহ অন্যান্য .৮%।

গবেষনা করে দেখ গেছে শুরু থেকে এ পর্যন্ত খ্রীস্টান ধর্মের সকল গীর্জায় যিশু বা ঈসা আলাইহিস সালাম এর যত ছবি বা ত্রুুশবিদ্ধ মূর্তি পাওয়া গেছে সব গুলোতে তাঁর বড় দাঁড়ি রয়েছে, মুসা আলাইহিস সালাম এর যে কল্পিত ছবি ইহুদী ও ইয়োরোপিয়ানরা প্রকাশ ও প্রচার করেছে তাতেও বড় দাঁড়ি বিদ্যমান। চীনের কনফুসিয়াসিজম ধর্মের প্রবক্তা কনফুসিয়াস এবং টো–ইজমের প্রবর্তক লেও–জু এর সকল ছবি ও প্রতিকৃতিতে বড় দাঁড়ি বিদ্যমান। শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক বিশাল দাঁড়িধারী ছিলেন।

হিন্দু ধর্ম অতিপ্রাচীন, এটাকে তাই সনাতন ধর্মও বলা হয়, এ ধর্মের নিদিষ্ট কোন প্রবক্তা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায়না। তবে কিছু কিছু ঐতিহাসিকের মতে সম্ভবত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম বা তার কোন অনুসারী আর্যদের নিকট কিছু সহিফা নিয়ে এসে একে শ্রুবাদী ধর্ম প্রচার করেছিলেন। যে কারনে তাদের বেদ, গীতা, ইত্যাদি প্রধান ধর্মগ্রন্থসমূহে একত্ববাদের জোরালো সমর্থন পাওয়া যায়। কালের পরিক্রমায় তাদের ধর্মে বিরাট পরিবর্তন ঘটে এবং ধর্ম প্রচারকদেরকে তারা ঈশ্বরের অবতার বা কোন কোন ক্ষেত্রে ঈশ্বর হিসাবে পুজনীয় করে তোলে। তাদের ধর্মে উল্লিখিত আছে ব্রক্ষ্যা এক অদ্বিতীয়। ব্রক্ষ্যা শব্দটি হিব্রভাষার ইব্রাহিম শব্দের অপভ্রংশ বলে অনেক গবেষক মনে করেন। সে হিসাবে ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর অনুকরনে হিন্দু ধর্মের ব্রক্ষ্যার মূর্তিতে দাঁড়ি রয়েছে, তাছাড়া তাদের মুনি ঋষি ও আধ্যাত্বিক ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশই দাঁড়িধারী।

এক মাত্র বৌদ্ধ ধর্মের প্রবক্তা গৌতম বুদ্ধের ছবি বা মূর্তিতে দাঁড়ি নেই। এর কারন হচ্ছে জিনগত করনে পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলের (ভারতের কিছু এলাকা, থাইল্যান্ড, বার্মা, তিব্বত, চায়না, কোরিয়া ইত্যাদি) মানুষ অজাত দাঁড়ি হয়ে থাকে অর্থাৎ প্রকৃতগতভাবে তাদের দাঁড়ি গজায়না বা গজালেও তা এত কম ও হালকা থাকে যে দৃষ্টিগোচর হয়না। বুদ্ধ সে ধরনের এলাকার অধিবাসী ছিলেন বিধায় ধর্ম প্রচারক হিসাবে একমাত্র তাঁর ছবি ও প্রতিকৃতিতে দাঁড়ি অনুপস্থিত। মজার ব্যাপার হচ্ছে হিন্দু ধর্মে বুদ্ধকে যেখানে বিষœর অবতার হিসাবে দেখানো হয়েছে সেখানে তার মূর্তিতে দাঁড়ি বিদ্যমান। এছাড়া সক্রেটিস (যাঁকে লোকমান হাকীম বা কোন প্রেরীত সতর্ককারী হিসাবে সন্দেহ করা হয়) ও এরিস্টোটল সহ পৃথিবীর অধিকাংশ স্মরণীয় বরণীয় ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের চেহারা দাঁড়ি দ্বারা শোভিত ছিল।

৬.দাঁড়ি কতটুকু লম্বা রাখবেন

আমাদের মধ্যে একটা বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা হল যে দাঁড়ি রাখা সুন্নাত, সুতরাং এটা রাখলেও চলে না রাখলেও চলে। রাসূলের যেসব সুন্নাত সব মানুষের অনুকরণের জন্য তাকে বলে সুন্নাতে ইবাদাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা মানুষ হিসেবে করেছেন এবং সাধারণের স্বাধীনতা উন্মুক্ত রেখেছেন সেটাকে বলে সুন্নাতে আদাত। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুলও রাখতেন আবার ছোট করে কেটেও রাখতেন। এটা সুন্নাতে আদাত। কিন্তু‘ তিনি দাঁড়ি কখনো কাটেননি, কাটার অনুমতি দেননি, বরং তা ছেড়ে দিতে বলেছেন। তাই দাঁড়ি রাখা সুন্নাতে ইবাদাত হিসেবে ওয়াজিব, যা লঙ্ঘনের মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভিশাপের সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়। ইমাম আবু হানিফা, মালিক, শাফী, আহমদ বিন হাম্বল, ইবনে তাইমিয়া, ইবন হাজাম, বিন বায, নাসিরুদ্দিন আলবানি সহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সকল আলিম দাঁড়ি কাটাকে হারাম বলেছেন। যিনি আল্লাহকে সত্যিই রব হিসেবে মেনে নিয়েছেন তার মনে রাখা উচিত মুমিনদের কথা হল “সামি’না ওয়া ওয়া আত্ব’না”– আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।

কোনো কোনো হাদীসে দাঁড়ি লম্বা রাখার আদেশের সাথে মুশরিকদের বিরোধিতার কথাও বলা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, দাঁড়ি যেমন শরীয়তের একটি বিধান তেমনি তা মুসলমানের পরিচয়–চিহ্ন, যার দ্বারা মুমিন–মুসলমানকে প্রথম দৃষ্টিতেই আলাদা করে চেনা যাবে। এটি মুসলমানের জাতীয় চেতনাবাহী একটি বিষয়। অমুসলিমদের সাথে স্বাতন্ত্র রক্ষা ইসলামের একটি মৌলিক বিধান। বেশ–ভূষা, পর্ব–উৎসব, আইন–আদালত, শিক্ষা–সংস্কৃতি–এককথায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে মুসলিম–স্বাতন্ত্র রক্ষা করা অপরিহার্য। আর তা হবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শের অনুসরণ ও অনৈসলামিক রীতি–নীতি পরিহারের মাধ্যমে। এ কারণে উপরোক্ত হাদীসসমূহে মুশরিক–মাজূস ও ইয়াহুদ–নাসারার বিরোধিতার যে আদেশ করা হয়েছে তা দাঁড়ির বিধানটিকে আরো তাকীদ করেছে এবং ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। বর্তমান সময়ে এর গুরুত্ব অনেক বেশি এবং সওয়াব ও ফযীলতও ইনশাআল্লাহ অনেক বেশি। কারণ অমুসলিমদের বিকৃতি এখন মুসলমানদের মাঝেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেক ভালো মানুষও শুধু সমাজের অনুকরণ করতে গিয়ে এই বিকৃতিকে গ্রহণ করেছে। এটা নিঃসন্দেহে ‘ফাসাদুল উম্মাহ’ বা উম্মতের অধঃপতন ও আদর্শ ত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত। সুতরাং এ সময় দাঁড়ি রাখা অর্থ– উম্মতের আদর্শ ত্যাগের সময় রাসূলের সুন্নাহ ও আদর্শের একটি অংশের উপর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। এভাবে এই সময়ে যারা আল্লাহর রাসূলের আদর্শকে ধারণ করবেন এবং তাঁর পূর্ণঅনুসারী হবেন ইনশাআল্লাহ তারা শহীদের মর্যাদা লাভ করবেন। আল্লাহর রাসূল বলেছেন–আমার উম্মতের ফাসাদ (আদর্শ ত্যাগের) সময় যে আমার সুন্নাহ (আদর্শ) কে ধারণ করবে সে শহীদের মর্তবা লাভ করবে। দাঁড়ি এক মুষ্টি বা চার আঙ্গুল পরিমান লম্বা রাখা ওয়াজিব।

৭.দাঁড়ি কতটুকু কাটবেন

দাঁড়ি এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত অংশ কাটার সুযোগ শরীয়তে রয়েছে।

১.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লহু আনহু যখন হজ্জ্ব বা ওমরা আদায় করতে, তখন স্বীয় দাঁড়ি মুষ্টি করে ধরতেন, অতঃপর অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন। (সহীহ আল বুখারী : ৮৭৫)

২.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু স্বীয় দাঁড়ি ধরতেন, অতঃপর অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন। (মুসান্নাফ লি–ইবনি আবি শাইবা : ১১২)

৩.হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত অংশ কেটেছেন।

৪.হযরত আবু যুরআ রাহ. বলেন, হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর দাঁড়ি মুঠ করে ধরতেন। এরপর এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা)

৫.হযরত নাফে রাহ. বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুষ্ঠির অতিরিক্ত দাঁড়ি কেটে ফেলতেন। (প্রাগুক্ত)

৬.হযরত হাসান বসরী রাহ. বলেন, তাঁরা (সাহাবা–তাবেয়ীগণ) মুষ্ঠির অতিরিক্ত দাঁড়ি কাটার অবকাশ দিতেন। (প্রাগুক্ত)

কিন্তু‘ কোনো সহীহ বর্ণনায় এক মুষ্ঠির ভিতরে দাঁড়ি কাটার কোনো অবকাশ পাওয়া যায় না। সাহাবা–তাবেয়ীনের এই আমলকে পূর্বোক্ত মারফূ হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা যায়। সুতরাং এ বিষয়ের হাদীস ও আছার থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দাঁড়ি লম্বা রাখা ওয়াজিব, কেটে বা ছেটে এক মুষ্ঠির চেয়ে কম রাখার অবকাশ শরীয়তে নেই। কাহকে এক মুষ্ঠির কম কিংবা তার চেয়েও ছোট ছোট দাঁড়ি রাখতে দেখা যায় এর দ্বারা দাঁড়ি রাখার বিধান পালন হয় না। আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহে যখন দাঁড়ি রাখার প্রেরণা সৃষ্টি হয়েছে তখন এমনভাবেই রাখা উচিত, যা তাঁর নিকটে মকবুল হবে। অন্যথায় বিষয়টি এই দাঁড়াবে যে, এতদিন শয়তান একভাবে বিভ্রান্ত করেছিল এখন অন্যভাবে বিভ্রান্ত করল।

৮. দাঁড়ি মুন্ডন হারাম

মানুষ মনে করে যে দাঁড়ি হচ্ছে পুরুষের জন্য অনাকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। কিন্তু তারা এই কথা চিন্তা করে না যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে সুন্দর মানুষ এবং তাঁর দাঁড়ি ছিলো। দাঁড়ি রেখেও যদি তিনি সব চাইতে আকর্ষণীয় মানুষ হতে পারেন তা হলে আপনি কেন দাঁড়ি রাখাকে অনাকর্ষণীয় ভাবছেন? আপনি কি দাঁড়ি রেখে দেখেছেন কখনও? আপনি নিজেকে আকর্ষণীয় রাখতে দাঁড়ি মুন্ডাচ্ছেন। দাঁড়ি মুন্ডানো যে হারাম সেটা কি আপনি জানেন না?

১. পবিত্র কুরআনের আল্লাহ বলেন,“(শয়তান বলল) আমি অবশ্যি তাদের পথভ্রষ্ট করবো,তাদের মনে মিথ্যা আকংখা সৃষ্টি করবো, তারা আমার নির্দেশ মতো পশুর কান ছিদ্র করবে এবং আমি তাদের নির্দেশ দিয়ে যাবোই এবং তারা অবশ্যি আল্লার সৃষ্টিকে বিকৃতি করতে থাকবে। যে কেউ আল্লাহর পরিবর্তে পরিবর্তে শয়তানকে অলি (বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক) হিসেবে গ্রহণ করবে, যে অবশ্যি নির্মজ্জিত হবে সুষ্পষ্ট ক্ষতির মধ্যে। (নিসা–৪ আয়াত : ১১৯) দাঁড়ি মু–ন করা বা কর্তন করা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করার শামিল।

১.আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : দশটি জিনিস স্বভাবজাত। তম্মধ্যে তিনি উল্লেখ করেছেন : গোঁফ কর্তন করা ও দাঁড়ি ছেড়ে দেয়া।” (মুসলিম) অতএব গোঁফ লম্বা করা আর দাঁড়ি কেটে ফেলা সুস্থ স্বভাব বিরোধী কাজ।

২.হযরত ইবনে ওমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা মুশরিকদের বিরোধীতা কর। দাঁড়ি ছেড়ে দাও এবং গোঁফ ছোট কর। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম) সুতরাং গোঁফ লম্বা করা আর দাঁড়ি কেটে ফেলা সুস্থ স্বভাব বিরোধী কাজ।

৩.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “গোঁফ ছেঁটে ফেল এবং দাঁড়ি লম্বা কর আর এর মাধ্যমে অগ্নি পূজকদের বিরোধিতা কর।” (সহীহ মুসলিম)

৪.রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “যারা কোন জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।” (আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ) বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যাবতীয় বিষয়ে মুশরিক–হিন্দু, ইহুদী–খৃষ্টান ও অগ্নি পূজকদের বিরোধিতা করা প্রতিটি মুসলমানের উপর ওয়াজিব।

৫.রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “যে ব্যক্তি গোঁফ কাটে না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (জামে আত তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ ওয়াজিব বা আবশ্যকতার দাবী রাখে। সমাজে অনেক মানুষকে দেখা যায় যে, তারা দাঁড়ি রাখেন না কিন্তু গোঁফ রাখেন।

৬.ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর সাদৃশ্য অবলম্বনকারী পুরুষকে এবং পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারীনী নারীকে অভিশাপ করেছেন।” (সহীহ আল বুখারী, আবু দাউদ, জামে আত তিরমিযী)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, দাঁড়ি মু–ন করা হারাম।

ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, দাঁড়ি মু–ন, উঠানো বা কর্তন করা কোনটাই জায়েজ নয়।

শায়খ বিন বায (রহ.) বলেন, দাঁড়িকে সংরক্ষণ করা, পরিপূর্ণ রাখা ও তা ছেড়ে দেয়া ফরয। এই ফরযের প্রতি অবহেলা করা জায়েজ নয়।

শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন, দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব, উহা মু–ন করা হারাম বা কাবীরা গুনাহ।

অতএব দাঁড়ি মু–ন করা বড় পাপ। এ থেকে তাওবা করা আবশ্যক। অবশ্য দাঁড়ি মু–ন করা ও কেটে ছোট করার পাপ এক সমান নয়। যদিও উভয়টিই পাপের কাজ।

৯. দাঁড়ি মুন্ডন করা কবীরা গুনাহ

অনেক মানুষ দাঁড়ি মু–ন করাটাকে খুবই ছোট ও তুচ্ছ ব্যাপার মনে করে। কিন্তু ইহা মু–ন করা কোন সময় সবচেয়ে বড় গুনাহের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কেননা এটা প্রকাশ্যে পাপের কাজে লিপ্ত হওয়ার অন্যতম। আর প্রকাশ্যে এভাবে অন্যায়ে লিপ্ত হয়ে তাওবা না করলে হতে পারে দাঁড়ি মুন্ডনকারী আল্লাহর কাছে ক্ষমা পাবে না। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,“আমার উম্মতের সবাইকে ক্ষমা করা হবে। কিন্তু‘ যারা প্রকাশ্যে পাপের কাজে লিপ্ত হয় তাদেরকে ক্ষমা করা হবে না।” (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এরুপ নির্দেশ ওয়াজিব বা আবশ্যকতার দাবী রাখে। অন্য দিকে দাঁড়ি মুন্ডন করার মাধ্যমে নিজেকে নারীদের কাতারে শামিল করা হয়। কেননা নারীরা দাঁড়ি বিহীন। কোন নারী যদি পুরুষের আকৃতি ধারণ করে এবং কোন পুরুষ যদি নারীর আকৃতি ধারণ করে তবে তারা লা’নত প্রাপ্ত।

১০. দাঁড়ি কাটা ইসলামে লঙ্ঘন

দাঁড়ি কামানোর গুনাহসমূহ নিম্মে উল্লেখ করা হলো–

আল্লাহ সুবহানাহু এর অবাধ্যতা

১.আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, “আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল যখন কোনো ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও কোনো মুমিন নারীর তাদের সে ব্যাপারে নিজেদের কোনো রকম এখতিয়ার থাকবে না (যে তারা তাতে কোনো রদবদল করবে); যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবে, সে নিসন্দেহে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়ে যাবে।” (আহযাব–৩৩ আয়াত : ৩৬)

২.আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেয়াই কেবল আমার দায়িত্ব যে কেউ আল্লাহকে এবং তাঁর রাসূলকে অমান্য করবে, তার জন্যে জাহান্নামই অবধারিত, চিরদিন চিরকাল তার পড়ে থাকবে সেখানেই। (জ্বিন–৭২ আয়াত : ২৩)

৩.আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, রাসূল তোমাদের যা কিছু দেয় তা তোমরা গ্রহণ করো এবং সে যা কিছু নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাকো, আল্লাহতায়ালাকেই ভয় করো; অবশ্যই আল্লাহতায়ালা কঠোর শাস্তিদাতা।” (হাশর–৫৯ আয়াত : ৭)

আল্লাহর অবাধ্যতাতে মগ্ন হবার সময় আমাদের মনে রাখা উচিত, আল্লাহর একটি মাত্র আদেশের অবাধ্যতা করে শয়তান জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল।

১.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,“আর আমি যা কিছু নিষেধ করেছি তা থেকে বেঁচে থাকো।”

২.হযরত আমর ইবন শুয়াইব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,“বার্ধক্যে (সাদা চুলকে) উপড়ে ফেলো না। কেননা তা কিয়ামতের দিন মুসলমানের জন্য আলোকবর্তিকা হবে”। (জামে আত তিরমিযি, আবু দাউদ, রিয়াদুস সালেহিন )

৩.যে আমার সুন্নাহ‘র বিরাগ ভাজন হয়, তার আমার সাথে কোন লেনদেন নেই। (সহীহ আল বুখারী : ৪৬৭৫)

দাঁড়ি কিংবা মাথা থেকে চুল উপড়ে ফেলার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। প্রকৃতপক্ষে, যে তার দাঁড়ি কামিয়ে ফেলে সে কালো কিংবা সাদা উভয় প্রকার চুলের বৃদ্ধিকেই অপছন্দ করে থাকে, অথচ সাদা দাঁড়িকে কিয়ামতের দিন মুসলমানের জন্য নূর হিসেবে বলা হয়েছে। ইমাম গাযযালী এবং ইমাম নওয়াবী (রাহিমাহুল্লাহ) উভয়ে বলেছেন, “যখন দাঁড়ি গজাতে শুরু করে তখন তা উপড়ে ফেলা হল মুরদের সাথে সাদৃশ্য এবং একটি বড় মুনকারাত (মন্দ কাজ)”

৪.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, পারস্যের সম্রাট কিসরা ইলমেনের শাসকের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দু’জন দূত পাঠান। এদের দাঁড়ি ছিল কামানো আর গোঁফ ছিল বড় বড়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তাদের এই অবয়ব এতই কুৎসিত লেগেছিল যে তিনি মুখ অন্য দিকে ঘুরিল জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের ধ্বংস হোক, এমনটি তোমাদের কে করতে বলেছে? তারা উত্তর দিল, আমাদের প্রভু কিসরা। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন উত্তর দেন, আমার রব্ব, যিনি পবিত্র ও সম্মানিত আদেশ করেছেন যেন আমি দাঁড়ি ছেড়ে দেই এবং গোঁফ ছোট রাখি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবাধ্যতা

ইবনে ওমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আদেশ করেছেন, “গোঁফ ছোট করে কেটে রাখ, আর দাঁড়িকে ছেড়ে দাও।”

উল্লেখ্য যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদেশ যে মানছে সে মূলত আল্লাহর আদেশই মানছে। আর যে রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদেশ মানলোনা সে আল্লাহর আদেশেরই অবাধ্য হল।

যারা ভাবছেন আল্লাহ ও তার রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু আদেশ না মানলেও চলে, তাদের জন্য আল্লাহ কঠোর সতর্কতাবাণী দিলছেন “আর যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে অমান্য করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাতে তারা চিরস্থায়ী হবে।”

রাসুলদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত থেকে বিচ্যুতি

আল্লাহর প্রেরিত সব রাসূলদের বর্ণনায় দাঁড়ির কথা পাওয়া যায়। সূরা তোয়াহাতে হারুন আলাইহিস সালাম এর দাঁড়ির বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ আমাদের নিশ্চিত করেছেন যে, শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি মুসলিমের জন্য উস্ওয়াতুন হাসানা সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ, কর্মে বা গড়নে।

হযরত জাবির বিন সামুরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়ি ছিল অনেক বড়। এখন একজন ক্লিনশেভড মুসলিম আয়নায় দাঁড়িল দেখুক কাফির স¤্রাট সারকোজির সাথে তার চেহারা বেশী মেলে না রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে। একজন দাঁড়ি সাইজ করে রাখা মুসলিম আয়নায় দাঁড়িয়ে ভাবুক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছেড়ে দেয়া দাঁড়ির চেয়ে সে কেন বেছে নিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অপমানকারী লেখক সালমান রুশদির সাহিত্যিক দাঁড়িকে।

সাহাবাদের সুন্নাত থেকে বিচ্যুতি

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাদের দৈহিক বর্ণনার মধ্যে দাঁড়ির দৈর্ঘ্যের কথাও এসেছে। হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর দাঁড়ি ঘন ছিল, হযরত ওমর ও হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এর দাঁড়ি ছিল দীর্ঘ। হযরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু এর দাঁড়ির দৈর্ঘ্য ছিল দু’কাঁধের দূরত্বের সমান।

খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাতকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁত দিয়ে হলেও আকড়ে থাকতে বলেছিলেন। দাঁড়ি ছোট করতে করতে পাতলা ঘাসের স্তর বানিল কার সুন্নাতের দিকে যাচ্ছি আমরা?

কাফিরদের অনুকরণ

১.হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেন, গোঁফ ছোট কর ও দাঁড়ি বড় কর, মাজুসিদের (পারস্যের অগ্নি উপাসক) চেয়ে অন্য রকম হও।

২.হযরত আবু উমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন “গোঁফ ছোট কর ও দাঁড়ি বড় কর, কিতাবধারীদের (ইহুদি–খ্রীষ্টান) বিরোধীতা কর।

৩.হযরত ইবনে ওমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন “মুশরিকদের চেয়ে আলাদা হও গোঁফ ছোট কর ও দাঁড়ি বড় কর।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বার বার সাবধান করে বলেছেন যে যাকে অনুকরণ করবে সে তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। আমরা কাতর আহবান জানাই প্রতি ওয়াক্ত সলাতে, সূরা ফাতিহাতে গইরিল মাগদূবি আলাইহিম ওয়ালাদ্বোয়াল্লিন। কাদের থেকে আলাদা হতে চাই? তাদের থেকে যারা সত্য জানার প্রতি বিমুখ ছিল, তাদের থেকে যারা সত্য জেনেও মানেনি। তবে কি আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবাদের রাদিয়াল্লাহু আনহু পরিবর্তে অনুসরণ করছি মুশরিক–ইহুদি–খ্রীষ্টান–অগ্নি উপাসকদের, যাদের অন্তিম পরিণাম জাহান্নামের আগুন?

ঔদ্ধত্য ও হেদায়েতের পথ হারিয়ে ফেল

রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ (আদেশ, কাজ এবং গুণগতভাবে) বলছে দাঁড়ি বড় করার কথা, সেহেতু এটা কামিয়ে ফেলা হচ্ছে তাঁর সম্মানিত সুন্নাহ তথা জীবনাচরণের প্রতি একটি চরম অপমান।

১.আল্লাহ বলেন,“যে রাসূলের আনগত্য করলো, সে আল্লাহরই আনগত্য করলো। আর যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় আমরা তোমাকে তাদে উপর রক্ষক নিযুক্ত করিনি। (নিসা–৪ আয়াত : ৮০)

১.তিনি বলেছেন, “যে আমার সুন্নাহর বিরাগভাজন হয় সে আমার দলভুক্ত নয়”। (সহীহ মুসলিম : ৩২৩৬; সহীহ আল বুখারী, মুসনাদে আহমদ, সুনানে নাসায়ী)

২.আল্লাহ বলেন,“যে কেহ এমন আমল করবে যা করতে আমরা নির্দেশ দেইনি,তা প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম)

দাঁড়ি সুন্দরতম গঠনে সৃষ্টি আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে একটি নিয়ামত এবং মর্যাদা। নিঃসন্দেহে দাঁড়ি কামানো সেই নিয়ামতকে অস্বীকার করে এবং যেই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেখানো পথ সর্বোত্তম পথ, সেই পথ থেকে বিচ্যুত হওয়াও বটে। এটা আমাদেরকে অবিশ্বাসীদের মতো স্তরেও নামিয়ে দেয় যাদের কাছে তাদের বদ কর্মগুলো সুশোভিত হয়ে দেখা দেয়; এভাবেই তাদের বিকৃত স্বভাব–প্রকৃতি আজকে তাদের বোধশক্তির এতটাই বিলোপ ঘটিয়েছে যে, তারা আজ বলছে, সভ্যতার অগ্রগতি ও অবস্থা অনুধাবনের জন্যে নারী পুরুষের বড় বাহ্যিক পার্থক্যগুলো (উদাহরণ স্বরুপ; দাঁড়ি) দূরীকরণ আবশ্যক !

আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন–বিকৃতি ঘটানো

আল্লাহর কাছে অন্যতম ঘৃণিত ব্যাপার হলো তার সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনা, যার অনুমোদন তিনি দেননি। একজন পুরুষ বলাপ্রাপ্ত হলে তার বহিপ্রকাশ হবে তার চেহারায় এটাই আল্লাহর সৃষ্টি। যে দাঁড়ি কাটছে সে আল্লাহর সৃষ্টি বদলে দিচ্ছে, মেনে নিচ্ছে শয়তানের আদেশ।

পবিত্র কুরআনের আল্লাহ বলেন, তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের জন্যে কায়েম করো। আল্লাহর ফিতরতের (প্রকৃতির) উপর প্রতিষ্ঠিত হও, যে ফিতরতের উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টি–প্রকৃতির কোনো পরিবর্তন হয়না। এটাই সঠিক সুষম দ্বীন। তবে অধিকাংশ মানুষই জানেনা। (রুম–৩০ আয়াত : ৩০)

উক্ত আয়াতের তাফসীরে ‘খালক‘ শব্দটি দ্বারা মানুষের ফিতরাহ তথা স্বাভাবিক স্বভাব প্রকৃতিকে বোঝানো হয়েছে।

ফিতরাগত বৈশিষ্টের পরিবর্তন সাধন হল শয়তানের অনুসরণ এবং পরম করুণাময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অবাধ্যতা।

২.আমি অবশ্যি তাদের পথভ্রষ্ট করবো, তাদের মনে মিথ্যা আকাংখা সৃষ্টি করবো, তারা আমার নির্দেশ মতো পশুর কান ছিদ্র করবে এবং আমি তাদের নির্দেশ দিয়ে যাবোই এবং তারা অবশ্যি আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করতে থাকবে যে কেই আল্লাহর পরিবর্তে এই শয়তানকে অলি (বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক) হিসেবে গ্রহণ করবে, যে অবশ্যি নিমজ্জিত হবে সুষ্পষ্ট ক্ষতির মধ্যে। (নিসা–৪ আতয়াত : ১১৯ ।

১. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবধান করে বলেছেন, “আল্লাহ যেসব নারীদের অভিশাপ দিয়েছেন যারা উল্কি অঙ্কন করে এবং নিজেদের শরীরেও উল্কি আঁকে, এবং সেই সকল নারীদের যারা নিজেদের ভ্রু কামায় এবং যারা নিজেদের দাঁতের মাঝে কৃত্রিমভাবে ফাঁক বৃদ্ধি করে যাতে তাদেরকে দেখতে সুন্দর দেখায়, তারা আল্লাহর সৃষ্টির উপর নিজেরা পরিবর্তন সাধন করে।” এখন সৌন্দর্য বাড়াতে যদি কোন মেয়ে কপালের লোম তুলে আল্লাহর অভিশাপের যোগ্য হয় তবে একজন পুরুষ যার বৈশিষ্ট্যই মুখে দাঁড়ি থাকা তার অবস্থা কি হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতি এই অভিশাপের কারণ ব্যাখা করে বলেন,“আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি সাধন করা”। এই অভিশাপ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহর সৃষ্টিগত বৈশিষ্টের পরিবর্তন নিষিদ্ধ। কাজেই যে তথাকথিত “সৌন্দর্য বর্ধন” এর জন্য তার দাঁড়ি কামিয়ে ফেলে সে আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন সাধন করে, সুবহানাল্লাহ ! সমস্ত প্রশংসা তাঁরই যিনি সব ভুলত্রুটির ঊর্ধে এবং যিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন নিখুঁতভাবে।

দাঁড়ি কামানো ‘আন–নামাস‘র অন্তর্গত, যা হলো আরও বেশি ‘সুন্দর‘ হবার জন্যে মুখম–ল থেকে চুল কিংবা মহিলাদের চোখের ভ্রু উপড়ে ফেলা। পুরুষদের জন্যে যা অধিকতর কুৎসিত।

২.হযরত ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশটি বিষয় অপছন্দ করতেন, তার মধ্যে একটি হলো বার্ধক্যকে পরিবর্তন করা। (মুসতাদরাকে হাকেম : ৭৪১৮, ইবনে হাব্বান: ৫৭৭৫)

৩.সাবেত ইবনে আজলান মুজাহিদ হতে বর্ণনা করেন–তিনি বলেন, হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব তাঁর বার্ধক্যকে পরিবর্তন করতেন না। এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো আপনি কেন এমন করছেন না? অথচ হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বার্ধক্যকে পরিবর্তন করতেন। তিনি বললেন–নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে বার্ধক্যে পৌঁছলো কেয়ামতের দিন উহা তার জন্য নূর হবে। অতএব আমি আমার বার্ধক্যকে পরিবর্তন করতে চাইনা। (মুসনাদে শামেয়ীন : ২২৪০)

অবিশ্বাসীদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ

১.আল্লাহ পাক পবিত্র কালামে বলেছেন, “তারপওে আমরা তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি দ্বীনের বিশেষ শরিয়তের উপর। অতএব তুমি কেবল এ শরিয়তকেই অনুসরণ করো। অজ্ঞদেও খেয়াল খুশির অনুসরণ করোনা।” (আল জাসিয়া –৪৫ আয়াত: ১৮)

এইআয়াতে পরিষ্কারভাবে তাদের থেকে পৃথক হবার কথা বলা হয়েছে যারা নিজেদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর রাসুলের আদেশের অনুসরণ করে না। তাদের খেয়াল খুশির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত তাদের বাহ্যিক চেহারা–সাজ পোশাক এবং তারা তাদের বাতিল জীবনাচরণের থেকে যা অন্তর্ভুক্ত করে। কাজেই তাদের খেয়াল খুশির সাথে একমত পোষণ তাদের মিথ্যা বাতিল পথ অনুসরণেরই নামান্তর। আমাদের প্রতি আদেশ হল তাদের থেকে পৃথক হবার।

২. আল্লাহ পাক বলেন, “ তাদের অবস্থা শযতানের মতো। সে মানুষকে বলে : ‘কুফুরি করো।’ অত:পর সে যখন কুফুরি কওে, তখন শয়তান বলে : ‘তোামার সাথে আমার কোনো সর্ম্পক নেই, আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে ভয় করি।’ (হাশর– ৫৯ আয়াত : ১৬)

এইআয়াতে: “তারা তাদের মত যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল”, বিজাতিদের অনুকরণের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা। ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন: “এ কারণেই আল্লাহ মুমিনদেরকে নিষেধ করেছেন তাদের (অবিশ্বাসীদের) অনুকরণ করতে”।

কুরআনের শিক্ষা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি যা কিছু নাযিল হয়েছে তার অন্যতম শিক্ষা হল মুসলমানদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট রক্ষা করা। এ কারণেই আমাদের কথা, কর্ম, ইচ্ছা বাসনা ইত্যাদি এবং শরীয়তের বিষয়াদি পর্যন্ত যেমন সালাত, জানাযা, সাওম, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, পোশাক, চালচলন, আচরণ, অভ্যাস ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে জাতীয় বৈশিষ্ট রক্ষা করার জন্যে আল্লাহর রাসূল বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। এর পরেও যারা মুসলমানদের জাতিয় বৈশিষ্ট ত্যাগ করে অন্যদের অনুসরণ অনুকরণ করে তাদের প্রতি তিনি বলেছেন, “যে আমাদের সুন্নাহ পরিত্যাগ করে অন্যদের সুন্নাহ অনুসরণ করে সে আমাদের মধ্য হতে কেউ নয়।”

মদীনার ইহুদীরা এই উদ্দেশ্যগুলো বুঝতে পেরেছিল এবং অনুধাবন করেছিলো যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের থেকে সকল বিষয়ে আলাদা হতে যাচ্ছেন এমনকি একেবারে ব্যক্তিগত কোন বিষয়েও। তারা মন্তব্য করেছিলো, “আমরা যা করতাম কোন কিছুরই বিরোধীতা না করে এই লোকটি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ছাড়বে না।”

হাসান আল বসরী বলেন, “এমন ঘটনা খুব বিরল যে কেউ কাউকে অনুকরণ করে অথচ সে তার অনুসরণ করে না (ইহকাল এবং পরকালে)।”

১.সম্মানিত আনসারদের থেকে কয়েকজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল ! আহলে কিতাবীরা তাদের দাঁড়ি কামিয়ে ফেলে এবং গোঁফ লম্বা করে।” জবাবে তিনি বলেন, “তোমরা তোমাদের গোঁফ ছোট কর এবং দাঁড়ি ছেড়ে দাও এবং আহলে কিতাবিদের সাথে বৈসাদৃশ্য গ্রহণ কর।” তিনি আরও বলেন, “তোমরা গোঁফগুলো কর্তন কর এবং দাঁড়ি ছেড়ে দাও (অর্থাৎ বড় করো)। তোমরা অগ্নিপূজকদের বিপরীত কর”। (মুসলিম : ৫১০)

২.আরেকটি হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “গোঁফ ছোট কর (জুযযু), আর দাঁড়ি বাড়তে দাও, এবং মেজিয়ান (পৌত্তলিক)দের বিপরীত কর।” (সহীহ মুসলিম) জুযযু (সর্বোচচ পরিমাণ) গোঁফ কামানো। শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী বলেন, “ছেঁটে ফেলার অর্থ যাকিছু উপরের ঠোটের উপরে ছড়িয়ে থাকে, এবং সম্পূর্ণ দাঁড়ি কামিয়ে ফেলা নয়, কারণ এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাস্তবিক এবং সুনিশ্চিত সুন্নাহর বিরুদ্ধাচারণ।” এ কারণেই যখন ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) এর কাছে যারা দাঁড়ি কামিয়ে ফেলে তাদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি বলেন, “আমি মনে করি সে একটি কষ্টকর যুলুম করল”। দাঁড়ি কামিয়ে ফেলা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, “এটি একটি বিদ‘আত (ধর্মের নামে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়) যা লোকেদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে।” (আল বায়হাকী : ১৫১, ফাতহুল বারী : ২৮৫–২৮৬)

আল–কুথা, তীরের শেষভাগের পালকগুচ্ছ। ‘আল–কুথাতি বিল কুথালি, ‘পালকগুচ্ছ সেদিকে ইযায় যেদিকে তীর ছুটে যায়। এই উপমার সাহায্যে অমুসলিমদের কাজকর্মের অন্ধ অনুকরণ অনুসরণের কথা বোঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ এই উপমার সাথে আরেকটি উপমা দিয়ে বুঝিয়েছেন,

৩.“তোমরা তোমাদের পূর্ব্ব তোমরাও তাই করবে। “আমরা (সাহাবাগণ) জানতে চাইলাম, “হে আল্লাহর রাসূল ! আপনি কি ইহুদী ও নাসারাদের অনুকরণের কথা বলছেন?” তিনি বললেন, “নয়তো কারা?” (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

নারীদের অনুকরণ

১.ইবনু আব্বাস বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সব পুরুষদের অভিশম্পাত করেছেন যারা নারীদের অনুকরণ করে, আর সেসব নারীদের অভিশাপ দিয়েছেন যারা পুরুষের অনুকরণ করে। যে মুসলিম পুরুষ আল্লাহর দেয়া দাঁড়ি নিয়ে অস্বস্তিতে থাকে, সেটাকে কেটে সাফ করে মেয়েদের মত মুখায়বকে স্মার্টনেস ভাবে তারা আসলে নিজের পুরুষত্ব নিয়েই অতৃপ্ত থাকে। মেয়েদের আল্লাহ একভাবে বানিয়েছেন, পুরুষদের আরেকভাবে। এখন রাত যদি দিনের মত হয়ে যায়, আর দিন, রাতের মত তাহলে কি অবস্থা দাঁড়াবে? নারী–পুরুষের পরষ্পরের অনুকরণের কুফল আমরা দেখতে পাচ্ছি সমকামিতার প্লেগ আর বিবাহ–বিচ্ছেদের বন্যায়। আল্লাহর অভিশাপ মাথায় নিয়ে পরকালে কেন, ইহকালেও ভাল থাকা যায়না, যাবেনা।

২.হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহতায়ালার ভৎসনা ঐ সব পুরুষদের উপর যারা মহিলাদের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করে এবং ঐ সব মহিলাদের উপর যারা পুরুষদের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করে।” (আবু দাউদ, জামে আত তিরমিযি, সুনানে নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, সহীহ আল বুখারী : ৮৭৪)

৩.ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সমস্ত পুরুষের উপর লানত করেছেন যারা মহিলাদের সাথে সাদৃশ্য স্থাপন করে। (সহীহ আল বুখারী : ৫৪৩৫)

৪.হযরত নাফে’ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, একদিন হযরত ইবনে ওমার ও আবদুল্লাহ ইবনে আমর হযরত যুবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এর কাছে ছিলেন। এমতাবস্থায় এক মহিলা ঘাড়ে ধনুক বহন করে মেষ পাল তাড়াতে তাড়াতে এগিয়ে এল। আবদুল্লাহ ইবনে ওমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা তাকে জিজ্ঞেস করলেন; “তুমি পুরুষ না মহিলা? সে বলল; “মহিলা”। তখন তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে আমরের দিকে তাকালে তিনি বললেন; আল্লাহতায়ালা স্বীয় রাসূলের পবিত্র মুখ দিয়ে পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারী মহিলাদেরকে এবং মহিলাদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারী পুরুষদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। কোন সন্দেহ নেই, একজন নারীর ধনুক বহনের ফলে যদি পুরুষের অনুকরণ করা হয়ে থাকে তবে একজন পুরুষের পক্ষে দাঁড়ি কামিয়ে ফেলাটা আরো অধিক পরিমাণে নারীদের সাথে সাদৃশ্য বহন করে। একজন নারী যদি নকল দাঁড়ি লাগায় তাহলে যেমন তাকে পুরুষ বলে মনে হত তেমনি একজন পুরুষ যদি স্বীয় সৌন্দর্য ও দাঁড়ি কামিয়ে ফেলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তবে তাকে তার বাহ্যিক চেহারার কথা বাদ দিলেও তার মানসিকতার কারণেই তাকে মেয়ে বলে অনেকেরই ভুল হতে পারে।

আরো উল্লেখ্য, পুরুষ কর্তৃক নারীর এবং নারী কর্তৃক পুরুষের কন্ঠস্বর অনুকরণও এর আওতাভুক্ত। নারী যখন পুরুষের মত আঁট সাঁট, পাতলা ও শরীরের আবরণযোগ্য অংশ অনাবৃত থাকে এমন পোশাক পরিধান করে, তখন সে পুরুষের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং অভিসম্পাতের যোগ্য হয়।

আপনি যদি একজন সাধারণ আহলে সুন্নাহর অনুসারী মুসলিমকে জিজ্ঞেস করেন, “দাঁড়িবিহীন চেহারার পুরুষের সাথে কাদের মিল বেশি?” সে উত্তর করবে, “মহিলা, নাবালক অথবা ইহুদী, খৃষ্টান”। আলেমগণ এই মিলকে বলেছেন ‘আত–তাখান্নথ‘। বিখ্যাত আলেম ইবন আবদুল বার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “দাঁড়ি কামানো হারাম, শুধুমাত্র মেয়েলি স্বভাবজাত পুরুষেরাই তা করতে পারে।”

অঙ্গহানির অপরাধ

ইবনে আস শাকির হতে বর্ণিত, হযরত ওমর বিন আব্দুল আযিয (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, “দাঁড়ি কামানো হল মুথলা এবং রাসূলর নিষেধ করা কাজের একটি হল মুথলা”।

ইমাম ইবনে হাজম রাহিমাহুল্লাহ, তাঁর বই ‘মারাতিব আল–ইজমা‘ (ঐক্যমতের স্তর) এ উল্লেখ করেন “তাঁরা (আলেমগণ) একমত হয়েছেন যে, দাঁড়ি কামানো হল মুথলা এবং এটা অননুমোদিত।”

আলেমগণের কেউ কেউ দাঁড়ির ছেটে ছোট করাকে মুথলা বলেছেন, অনেকে দাঁড়ি কামিয়ে ফেলাকে মুথলা বলেছেন। একবার ভেবে দেখুন, সম্পূর্ণ দাঁড়ি কামিয়ে ফেলার মত অবস্থা সৃষ্টি হলে আলেমগণের বক্তব্য কি হতো?

ইমাম আহমাদ, আস–সাওরি এবং আবু হানিফা একমত পোষণ করে বলেন যে, যদি কারো দাঁড়িমু–ন করে দেয়া হয় তবে এটি একটি অঙ্গহানির অপরাধ এবং সে ব্যক্তিকে পূর্ণ ‘দিয়াহ‘ অথবা ‘রক্ত মূল্য’ পরিশোধ করতে হবে যেমনিভাবে বাদীকে তার চোখ কিংবা হাত হারানোর জন্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ‘রক্ত মূল্য‘ দেয়া হয়।

১.ইমাম বুখারী হতে বর্ণিত, সুমরাহ এবং ওমরান বিন হুসেইন রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত, প্রত্যেক খুতবায় রাসূল আমাদেরকে দান করতে ও আল–মুথলা (আকার বিকৃতি) থেকে বেঁচে থাকার কথা না বলে শেষ করতেন না।

২.রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডাকাতি এবং জোর জবরদস্তি করে অন্যের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া এবং অঙ্গহানিকে নিষেধ করেছেন।

৩.ইবনে হাজম বলেন, “তারা (মুসলিম আলেমগণ) একমত যে, দাঁড়ি কামানো একটি অঙ্গহানি, যা হারাম।” উপরন্ত, দাঁড়ি কামানো হচ্ছে আল্লাহর রাসূলের অবাধ্যতা এবং তা আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতা, কারণ:

৪.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে আমাকে মান্য করল সে আল্লাহকে মান্য করল, আর যে আমাকে অমান্য করল সে আল্লাহকে অমান্য করল। (সহীহ আল বুখারী)

ইবনে তাইমিয়া, একজন বিখ্যাত মুজাদ্দিদ (পুণর্জাগরণকারী), আলেম এবং মুজাহিদ, তিনি বলেন, “দাঁড়ি কামানো হারাম–কোনো আলেম দাঁড়ি কামানোর অনুমোদন করেনি।”

এ সম্পর্কে আমাদের এই আয়াতটি স্মরণ করা উচিত যেখানে আল্লাহ, মহাপবিত্র ও মহামহিম বলেন, আল্লাহর নির্দেশে তাঁর আনগত্য করা হবে– এ উদ্দেশ্য ছাড়া আমরা একজন রাসূলও পাঠাইনি। তার ( মুনাফিকরা) নিজেদের প্রতি কোনো যুলুম করার পর যদি এ পন্থা অবলম্বন করতো যে, তোমার কাছে ছু্েট আসতো, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতো এবং রাসূলও তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতো, তাহলে অবশ্যি তারা আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল ও পরম দায়াবান পেতো। (নিসা–৪ আয়াত : ৬৪)

দাঁড়ি লম্বা করার এই আদেশটির মর্যাদা এতটাই ছিল যে, দ্বীন ইসলামের সবচেয়ে বড় আলেমগণ ইমাম আবু হানিফা, আহমাদ, আস–সাওরি বলেছেন, “যদি কারো দাঁড়ি ‘আক্রান্ত‘ হয় পুরোপুরি মু–ন করার দ্বারা, এবং তা আর বেড়ে না উঠে, তাহলে দুষ্কৃতকারীকে এর পূর্ণ মূল্য (দিয়াহ) দিতে হবে, যেন সে দাঁড়িওয়ালা ব্যক্তিকে হত্যা করেছে।” ইবনে আল মুফলিহ (রাহিমাহুল্লাহ) ব্যাখা করে বলেন যে, “এটা এ কারণে যে, দুষ্কৃতকারী দাঁড়ি বেড়ে উঠার সমস্ত কার্যক্রমকে ব্যাহত করেছে। এটা সেই অপরাধের সমান যা আমরা কারো দৃষ্টি ছিনিয়ে নিলে বিবেচনা করি।”

বিশুদ্ধ ফিতরাতের বিরোধীতা

প্রতিটি শিশুই বিশুদ্ধ প্রকৃতির উপর জন্মায় যাকে বলে ফিতরাত। পরে পরিবেশের প্রভাবে,শয়তানের ধোঁকায় কিংবা আত্মপ্রবঞ্চণায় সে তা থেকে সরে যায়। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–দশটি আচরণ ফিতরাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত গোঁফ কাটা, দাঁড়ি ছেড়ে দেয়া, দাঁত মাজা, নাক ও মুখের ভিতর পানি দিয়ে পরিষ্কার করা, নখ কাটা, আঙুলের মাঝে ধোয়া, বগলের লোম পরিষ্কার করা, লজ্জাস্থানের চুল পরিষ্কার করা, লজ্জাস্থান পানি দিয়ে ধোয়া ও মুসলমানি করা। এই ফিতরাতের আচরণগুলো সকল যুগের সকল মুসলিমের জন্য প্রযোজ্য।

ইসলামকে উপহাস

দাঁড়ি না রাখতে রাখতে সমাজের অবস্থা এমন হয়েছে যে যদি কোন মুসলিম দাঁড়ি রাখে তাহলে তাকে কটাক্ষ করা হয়। মুসলিম দাঁড়ি দেখে অমুসলিমদের গাত্রদাহ হবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু‘ একজন মুসলিম যদি দাঁড়ি মন্ডিত কোন মানুষকে উপহাস করে তাহলে তার জেনে রাখা উচিত ইসলামের কোন বিষয় নিয়ে উপহাস করার ফলাফল ইসলামের গন্ডী থেকে বেরিয়ে যাওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা বলেন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলকে উপহাস করছিলে? কোন অজুহাত পেশ করো না! তোমরা ঈমান আনয়নের পর কুফরী করেছ। সমাজের নিকৃষ্ট লোকেরাও দাঁড়ি কামাতে লজ্জা বোধ করত ! এটা সহজেই অনুমিত যে প্রথম যুগের মুসলিম আলেমগণের কেউই কোনো দিন দাঁড়ি কামাননি। একবারও নয়। তৎকালীন মুসলিম শাসকেরা যাদের অনেকেই জাহেল ছিলেন তারা পর্যন্ত কোন দুষ্কৃতিকারীকে শাস্তি দিতে হলে তার দাঁড়ি কামিয়ে দিতেন এবং গাধা বা অন্য কোন পশুর পিঠে চড়িয়ে শহরময় ঘুরিয়ে আনতেন, সেই নিচু লোকগুলো পর্যন্ত তাদের দাঁড়ি কামানো চেহারা দেখানোর এই শাস্তিকে খুবই লজ্জাজনক মনে করত ! কেননা, দাঁড়ি কামানো; এটা হচ্ছে মেয়েলি একটা স্বভাব। এই জন্যেই অনেক আলেম মতামত দিয়েছেন,“কাউকে লঘু শাস্তি দিয়ে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হলে তার মাথা কামিয়ে দাও কিন্তু ‘দাঁড়ি কামিও না।” কারণ, প্রকৃত পক্ষে দাঁড়ি কামানো হারাম। আমরা কি দেখি না, যখন ইহরামের সময় শেষ হয়ে আসে তখন সুন্নাহ হচ্ছে মাথার চুল কামিয়ে ফেলা কিন্তু তখনও দাঁড়ি কামানো নয় ! সালফে সালেহীনগণের কঠোর অবস্থান ছিল সেই সকল লোকের সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যাপারে যারা কিনা নিজেদের দাঁড়ি কামিয়ে ফেলত। তাদেরকে অবিশ্বস্তলোক বলেই ইসলামে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। দুসুকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, “একজন পুরুষের দাঁড়ি কামানো হারাম, আর যে এটা করে তাকে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে।”

১১. দাঁড়ি না রাখা গোনাহের কাজ

আমাদের আগে জানতে হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত বলতে কি বোঝায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছোট/বড় সব আমল সবার জন্য ওয়াজিব নয়। রাসূলের কিছু সাধারণ আচার–আচরণ তাঁর সুন্নাত হলেও এর সবগুলো পালন করা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তবে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু আমল আছে যা সরাসরি ধর্মীয় নির্দেশ; কাজেই সে সব পালন করা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক বা ওয়াজিব। তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, রাসূলের সুন্নাতকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগের সুন্নাত সবার জন্য ওয়াজিব নয় এবং দ্বিতীয় ভাগের সুন্নাতগুলো তাঁর প্রতিটি উম্মতের জন্য ওয়াজিব বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। ঐতিহাসিক দলিল থেকে আমরা জানতে পারি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ি রাখতেন এবং এটি তাঁর সুন্নাত হিসেবে পরিগণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে দাঁড়ি কামাবে সে মালাউন, তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হয়। ইসলামি পরিভাষায় মালাউন সেই ব্যক্তিকে বলা হয় যে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত। কাজেই প্রতিটি মুসলমানের জন্য উত্তম হল দাঁড়ি না কাটা। বড় বড় আলেম, মুজতাহিদ ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতারা বলেছেন, মুসলমানদের উচিত দাঁড়ি না কামানো। যারা সত্যিকার দ্বীনদার ও মোত্তাকি তারা সতর্কতা অবলম্বন করেন। আমাদেরকে প্রথমে ইসলামের ফরয ও ওয়াজিবগুলোকে সঠিকভাবে আমল করার চেষ্টা করতে হবে। যখন অবশ্য পালনীয় কর্তব্যগুলো পুংখানুপুংখভাবে পালন করতে পারবেন তার পরই উচিত হবে মুস্তাহাবের প্রতি নজর দেয়া এবং মাকরুহ কাজ থেকে দূরে থাকা। যেহেতু দাঁড়ি কামানো হারাম তাই এ কাজ ত্যাগ করাই উত্তম। আমাদের মনে রাখতে হবে, সুন্নাত ও মুস্তাহাব পালন করার প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে যেন ফরয বা ওয়াজিব কাজ বাদ পড়ে না যায়।

যেহেতু দাঁড়ি কামানো হারাম সেহেতু এ কাজের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাই দাঁড়ি না কামানোই উত্তম। দাঁড়ি কম বেশী ঘন পাতলা যাই হোক না কেন দাঁড়ি রাখতে হবে। দাঁড়ি মুন্ডন করা গোনাহের কাজ।

বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস সমূহে দাঁড়ি সম্পর্কে ছয়টি শব্দ ব্যবহৃত হয়।

১. দাঁড়ি বাড়াও। (সহীহ আল বোখারী, সহীহ মুসলিম,আবুদাউদ, জামে আত তিরমিজী,সুনানে নাসায়ী)

২. দাঁড়ি পূর্ণ কর। (সহীহ মুসলিম)

৩. দাঁড়ি ঝুলন্ত ও লম্বা রাখ। (সহীহ মুসলিম)।

৪. দাঁড়ি বেশি রাখ (সহীহ আল বোখারী, সহীহ মুসলিম)

৫. দাঁড়ি বহাল রাখ (মাজমাউল বাহার)

৬. দাঁড়ি কে ছাড় অর্থাৎ কর্তন করা না (তাবরানী)।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল শব্দে নিছক দাঁড়ি রাখার আদেশ করেননি। বরং দাঁড়ি বৃদ্ধি করা লম্বা করা, পূর্ণ করা ও যাথাযথ বহাল রাখার তাগিদ দিয়েছেন।

১২.দাঁড়ি নিয়ে ঠাট্টা–বিদ্রুপ করা ইসলাম বিরোধী কাজ

কোন মানুষ যদি দাঁড়িকে অপছন্দ করে বা তা নিয়ে ঠাট্টা–বিদ্রুপ করে অথবা দাঁড়িওয়ালা মানুষকে তুচ্ছ–তাচ্ছিল্য করে, তবে সম্ভাবনা আছে একারণে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে কুফরীতে লিপ্ত হওয়ার এবং মুরতাদ হয়ে যাবার। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তা নিয়ে ঠাট্টা–বিদ্রুপ করা বা ব্যঙ্গ করা বা তা ঘৃণা ও অপছন্দ করা নির্দেশ ভঙ্গ হওয়ার অন্যতম একটি কারণ। আল্লাহ্ বলেন “এই কারণে যে, তারা এমন বস্তুর অনুসরণ করেছে যার প্রতি আল্লাহ রাগান্বিত। আর তারা তাঁর সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করেছে। ফলে তিনি তাদের আমলগুলো বরবাদ করে দিয়েছেন।” (মুহাম্মাদ–৪৭ আয়অত : ২৮) সাবধান! নিজের আমল বরবাদ করবেন না বা অজ্ঞতা বশত: ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবেন না। সালাত সিয়াম ও অন্যান্য ওয়াজিব বিষয়ে আপনি যেমন আপনার পালনকর্তার আনুগত্য করেছেন। ঠিক তেমনিভাবে দাঁড়ি রেখেও পালনকতার আনুগত্য করবেন। এব্যাপারে তাঁর নাফরমানী করবেন না।

১৩. মনীষীদের দৃষ্টিতে দাঁড়ির মূল্য ও সম্মান

হযরত আদম আলাহিস সালাম থেকে শুরু করে সমস্ত রাসূল ও রাসূলের বৈশিষ্ট্য ছিল দাঁড়ি রাখা। অনুরূপভাবে ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে–তাবেঈন ও আইম্মায়ে মুজতাহেদীন সকলেই দাঁড়ি রেখেছেন। এমন কোন বর্ণনা বা ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, তাঁদের মধ্যে কেউ দাঁড়ি কেটেছেন বা মু–ন করেছেন; বরং কারো দাঁড়ি না গজালে তার জন্য তাঁরা আফসোস করেছেন। সাহাবী ক্বায়স বিন সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়ি বিহীন লোক ছিলেন। তাঁর সম্প্রদায় আনসাররা বললেন, হায় দাঁড়ি যদি বাজারে কিনতে পাওয়া যেত তবে আমরা তাঁর জন্য দাঁড়ি কিনে নিতাম।

প্রখ্যাত তাবেঈ আহনাফ বিন কায়স একজন বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী লোক ছিলেন। তিনি সৃষ্টিগত দিক থেকে খোঁড়া ও এক চোখ অন্ধ ছিলেন। তাঁর দাঁড়িও উঠেনি। অথচ তিনি ছিলেন নিজ গোত্রের নেতা। লোকরা বলল, “বিশ হাজার দীনার খরচ করেও যদি যদি দাঁড়ি কিনতে পাওয়া যেত তবে আমরা তাঁর জন্য তা খরিদ করতাম। কি আশ্চর্য! লোকেরা তাঁর পা বা চোখের ত্রুটিকে ত্রুটি মনে করল না। কিন্তু তারা দাঁড়ি না থাকাটাকে অপছন্দ করল। কেননা তাঁরা দাঁড়িকে মনে করতেন পৌরুষত্বের পরিচয়, মুসলিমের সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের পূর্ণতার প্রতীক। তাঁরা দাঁড়ি বাঁচাতে গিয়ে এবং তার সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে নিজের গর্দান দিয়ে দেয়াকে সহজ মনে করতেন। কিন্তু আফসোস! তারা দাঁড়ির প্রতি আমরা এতই রুষ্ট যে, অর্থ–সম্পদ ব্যয় করে হলেও তার বিরুদ্ধে যেন অঘোষিত লড়াইয়ে নেমে পড়েছে। হাজার টাকা খরচ করেও যদি এমন হত যে আর কখনো মুখে দাঁড়ি গজাবে না, তারা সে পথেই অগ্রসর হতো। (নাঊযুবিল্লাহ)

১৪.দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব না সুন্নাত

দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব নাকি, সুন্নাত? একদল বলে এটি বাধ্যতা মূলক কিন্তু‘ আমাদের দেশের অধিকাংশরা বলে থাকে এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ, আমরা তাহলে কোনটা মানব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কথাই নেজে থেকে বলেন না, তার সকল কথাই ওহী। তাই আমাদের জানতে হবে দাঁড়ি সম্পর্কিত হাদীস গুলো। তা ওহী ছিল নাকি, তাঁর সাধারণ কর্ম ছিল। হাদীস বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকে, তবে আমাদের বিষয় অনুসারে আমরা দুই ধরনের হাদীসের দিকে দৃষ্টিপাত করব।

১.রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করেছেন কিন্তু‘ অন্যদের করতে বাধ্য করেননি তা মূলত আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ বলে থাকি। কোন সাহাবী যদি বর্ণনা করেন যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এরূপ–এরূপ দাঁড়ি ছিল, কিন্তু‘ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর থেকে কোন আদেশ মূলক কথা পাওয়া যায় না যে দাঁড়ি রাখতে হবে, তবে দাঁড়ি রাখা সুন্নাহ বলে সাব্যস্ত হবে।

২.কিন্তু‘ দাঁড়ির ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদেশ মূলক হাদীস পাওয়া যায় যা প্রমাণ করে যে দাঁড়ি লম্বা করা ওয়াজিব। উল্লেখ্য বিষয় যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ি রাখতে বলেননি, যদি শুধু রাখতে বলতেন তবে আমরা বিভিন্ন স্টাইলের দাঁড়ি রাখতাম। কিন্তু‘ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন দাঁড়ি লম্বা করতে শুধু রাখতে নয়। সুতরাং দাঁড়িকে লম্বা করতে হবে।

দলীল :

১. হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ (আদেশ) করেন : তোমরা আচার–আচরণে মুশরিকদের বিরোধিতা কর। অতএব তোমরা দাঁড়ি লম্বা কর এবং মোচ এতটুকু ছোট কর যাতে ত্বকের রং পরিলক্ষিত হয়। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

২. হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ (আদেশ) করেন : তোমরা মোচ কেটে ফেল এবং দাঁড়ি লম্বা কর। তাতে অগ্নিপূজকদের সাথে বিরোধিতা সাধিত হবে। (সহীহ মুসলিম)

এই দুই হাদীস স্পষ্ট করে যে দাঁড়ি রাখা নয় বরং লম্বা করা ওয়াজিব। আমাদের দেশের হানাফি মাযহাব ধারী আলেমেরা বলে থাকেন দাঁড়ি রাখা সুন্নাহ। কিন্তু‘ তা হাদীস অনুসারে ওয়াজিব প্রমাণিত হয়। এমনকি সকল সাহাবী, আম্বিয়াগণ দাঁড়ি রাখতেন। দাঁড়ির বিষয়টি যদি শুধু সুন্নাহই প্রমাণিত হত তবে একজন হলেও পাওয়া যেত যেই সাহাবী দাঁড়ি রাখেন নি, কিন্তু‘ তা পাওয়া যায় না। তাই দাঁড়ি রাখুন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ মান্য করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে বলেন : তোমরা মুশরিকদের বিপরীত কর, দাঁড়ি ছেড়ে দাও আর গোঁফকে খাট কর। (সহিহ মুসলিম)

এ নিয়ে মানুষ মতবিরোধ করার কোন সুযোগ নেই দাঁড়ি রাখা যে ওয়াজিব সেটাই প্রণিধানযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য কথা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ি রেখেছেন বলেই ইহা রাসূলের সুন্নাত বলে তার গুরুত্ব কমিয়ে দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা রাসূল দাঁড়ি নিজে রেখেছেন এবং তা রাখার জন্যে নির্দেশও দিয়েছেন। আর আল্লাহতায়ালা যেমন ফরয করেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তেমনি ফরয বা ওয়াজিব করেন। তার কারণ হচ্ছে রাসূল কখনো নিজের কল্পনা প্রসূত কোন কথা বলতেন না। “আল্লাহ তাঁর নিকট যা ওহী করতেন তিনি তাই বলতেন।” (নজম–৫৩ আয়াত : ৪) তাছাড়া রাসূল দাঁড়ির বিষয়ে যে সকল আদেশ সূচক শব্দ ব্যবহার করেছেন তার বিপরীতে এমন কোন হাদীস খুঁজে পাওয়া যাবে না যা দ্বারা দাঁড়িকে সুন্নাত বা মুস্তাহাব সাব্যস্ত করা যাবে।

১৫.দাঁড়ি মু–ন নয় দাঁড়ি রাখা সৌন্দর্য ও ব্যক্তিতের বিষয়

আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করে তাকে নারী জাতী থেকে আলাদা ও বৈশিষ্ট্য ম–িত করেছেন। পৌরুষত্বের পরিচয় দাঁড়ি প্রদান করে তার সৌন্দর্যকে প্রস্ফুটিত করে। কিভাবে মানুষ তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে তাকে পরিবর্তন করে নিজেকে নারী জাতীর সাথে সাদৃশ্য করতে চায়? ইসলামের শত্রুদের সাথে নিজেকে মিলিত করতে চায়? আর ধারণা করে যে, এতেই রয়েছে অতিরিক্ত সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্ব? দাঁড়ি মু–ন না করলে বা না কাটলে যেন পুরুষের সৌন্দর্যই ফুটে উঠে না। পুরুষকে দাঁড়ি দিয়ে যেন আল্লাহ ভুল করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) তাই সেই ভুল শোধরাতে তারা যেন ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। আল্লাহ্ বলেন : “তোমরাই কি বেশী জ্ঞান রাখ না আল্লাহ অধিক জ্ঞান রাখেন?” (বাকারা–২ আয়াত : ১৪০)

দাঁড়িবিহীন পুরুষ যদি অধিক সুন্দর হত তবে তা করতে আল্লাহ অপারগ ছিলেন না। কিন্তু তিনি এর মাধ্যমে পুরুষকে সম্মানিত ও মর্যাদাবান করতে চেয়েছেন। পার্থক্য করেছেন নারীদের থেকে। দাঁড়ি মু–নে দুনিয়াবী কোন উপকার নেই, আখেরাতে কোন ছওয়াব–নেকী পাওয়া যাবে না, বরং নিজেকে আল্লাহর ক্রোধের সম্মুখীন হতে হবে। প্রতিদিন একটি অযথা পরিশ্রমে নিজেকে ক্লান্ত করতে হয়, সময় ও অর্থের অপচয় হয়, আল্লাহর নাফরমানী করা হয়।

১৬.দাঁড়ি জান্নাতি ছুরত (আকৃতি)

দাঁড়ি জান্নাতি ছূরত (আকৃতি) অথচ অত্যন্ত দু:খজনক হলেও সত্য, আমরা চুল কতটুকু বাড়লে লম্বা চুল বলা হয় বুঝি, নখ কতটুকু বাড়লে লম্বা নখ বলা হয় বুঝি, কিন্তু শুধু দাঁড়ি কতটুকু হলে এটাকে ঝুলন্ত বা লম্বা দাঁড়ি বলা যায় এটা বুঝেও বুঝিনা কারন লম্বা দাঁড়ি রাখলে আমাদেরকে বেকডেটেড মনে হয় আমরা আনস্মার্ট হয়ে যাই, ইয়োরোপিয়ানদের অনুসরণকারী ক্লিন শেভড অথবা চাপদাঁড়ি এবং শার্ট–টাই, টাখনুর নীচ পর্যন্ত প্যান্ট,পায়জামা ও লুঙ্গি পড়ি যা দুনিয়াবী ছুরত (আকৃতি), রাসূলের সুন্নাহ বিরোধী অথচ মৃত্যুর পর দাফনের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মিল্লাত হিসাবে আমাকে কবরে রাখা হবে, কবরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখানো হবে, হাশরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুপারিশ ও তার হাতে হাউজে কাওছারের পানি পান না করে আমাদের পরিত্রান নাই।

পবিত্র কুরআনের বলা হয়েছে– যে আল্লাহ ও তার রাসূলের বিধান মেনে চলবে সে অনন্তকাল স্বর্গোদ্যানে অবস্থান করবে যার তলদেশে ঝরণা ধারা প্রবাহিত, মূলত এটাই বিশাল সফলতা। (নিসা–৪ আয়াত : ১৩)

ক) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে আমার সুন্নাতকে ভালবাসে সে আমাকে ভালবাসে, যে আমাকে ভালবাসে সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে। (জামে আত তিরমিজী)

খ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, যে আমার সুন্নাতের পরোয়া করে না সে আমার উম্মত নয়। (সহীহ আল বোখারী, সহীহ মুসলিম)।

আজ চারদিকে হাহাকার, ইয়াহুদী খ্রীস্টানদের মিলিত চক্রের আক্রমনে মুসলমান আজ নির্যাতিত নিপীড়িত এর একমাত্র কারন আজ মুসলমান নিজের পরিচয়, নিজের ধর্মীয় ঐতিহ্য–চিহ্ন সব হারিয়ে ফেলেছে, আল্লার হুকুম রাসূলের ত্বরিকা ছেড়ে বিধর্মীদের নিয়ম নিতীকে নিজের আদর্শ আর ফ্যশন বানিয়ে নিয়েছে। অথচ পবিত্র কুরআনের আল্লাহ বলেন, “যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হুকুমের বিরোধিতা করে তাদের ভয় করা উচিৎ যে, তাদের উপর কোনো ফেতনা বা কোনো মর্মন্তদ শাস্তি আসতে পারে।” (নূর–২৪ আয়াত : ৬৩)

রাসূলের আলোকিত সুন্নাতের অবমাননার কারনেই কুরআনের ঘোষিত এই মর্মন্তদ শাস্তি আজ মুসলমান সমাজের উপর নেমে এসেছে। তাই মুক্তির পথ একটাই; আল্লাহ ও রাসূল প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীমের পথিক হওয়া, যে সিরাতুল মুস্তাকীমের কথা প্রতি নামাজে সূরা ফাতিহাতে আমরা বার বার উচ্চারণ করি কিন্তু বাস্তবে সে পথ থেকে দূরে থাকি।

আল্লাহ সুবানুহুতায়ালা আমাদের সকলকে দাঁড়ি রাখার গুরুত্ব অনুধাবন করে যারা এখন দাঁড়ি রাখিনি তাদের দাঁড়ি রাখার তৌফিক দান করুন এবং যারা দাঁড়ি সম্পর্কে আজে বাজে মন্তব্য করেন তাদের হেদায়াত দান করুন। যে কাজ করলে আল্লাহ রাজি হবেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশি হবেন সে কাজ করার এবং যে কাজে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ রয়েছে তা থেকে আমাদেরকে বিরত থাকার তাওফীক দিন। আমীন।

You may also like