Home ইসলাম কুরবানীর সঠিক নিয়ম

কুরবানীর সঠিক নিয়ম

by admin
০ comment

কুরবানী আভি ধানিক ও পারিভাষিক অর্থে কুরবানী : কুরবানী শব্দের শাব্দিক অর্থ হল উৎসর্গ বা ত্যাগ। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় জিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে নির্দিষ্ট জন্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে জবেহ করাকে কুরবানী বলা হয়। কুরবানী মুসলমানদের জন্য আল্লাহর প্রতি অগাধ প্রেম ও অনুপম আনুগত্যের এক উজ্জল দৃষ্টান্ত।

কুরবানীর হুকুম এবং শর্ত : কুরবানী করা ওয়াজিব। তবে শর্ত সাপেক্ষে। ঢালাও ভাবে সকলের উপর ওয়াজিব নয়। যার কাছে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সমপরিমান অর্থ সম্পদ আছে তার উপরেই কুরবানী ওয়াজিব। অর্থাৎ নেসাব পরিমান মাল থাকলে কুরবানী অবশ্যই করতে হবে। যাকাতের ন্যায় কুরবানীতে সম্পদের বর্ষপূর্তি শর্ত নয়। বরং ফিতরার হুকুমের ন্যায়। ঈদের দিন যেমন কারো কাছে নেসাব পরিমান সম্পদ থাকলেই তার উপর ঈদ-উল-ফিতর আদায় করতে হয় তেমনি ঈদ-উল-আযহার দিন কারো কাছে নেসাব পরিমান সম্পদ আসলেই তার উপর কুরবানী ওয়াজিব। শরীয়ত যার উপর কুরবানী ওয়াজিব করেনি, এমন কোন ব্যক্তি যদি কুরবানীর দিন জবেহ করার ইচ্ছায় পশু ক্রয় করে তবে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়ে যায়। এছাড়াও কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য কুরবানী দাতার আরও কতিপয় শর্ত পূরণ হওয়া দরকার। সেগুলো হল সুস্থ মস্তিস্কের অধিকারী হওয়া, প্রাপ্ত বয়স্ক এবং বাড়িতে অবস্থানকারী (মুকিম) হওয়া।

কুরবানীর সময় : ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ¯্রষ্টা বা আল্লাহ ইসলামের নবী ইব্রাহীমকে স্বপ্নে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানী করার নির্দেশ দেন। এই আদেশ অনুযায়ী ইব্রাহিম তার সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কুরবানী করার জন্য প্রস্তুত হলে ¯্রষ্টা তাকে তা করতে বাধা দেন এবং পুত্রের পরিবর্তে পশু কুরবানীর নির্দেশ দেন। এই ঘটনাকে স্মরণ করে সারা বিশ্বের মুসলিম ধর্মালম্বীরা প্রতি বছর এই দিবসটি পালন করে। হিজরী বর্ষপঞ্জি হিসাবে জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু করে ১২ তারিখ পর্যন্ত ৩ দিন ধরে ঈদ-উল-আযহা চলে। হিজরী চন্দ্র বছরের  গণনা অনুযায়ী ঈদ-উল-ফিতর এবং ঈদুল আজহার মাঝে ২ মাস ১০ দিন ব্যবধান থাকে। দিনের হিসেবে যা সবোর্চ্চ ৭০ দিন হতে পারে। ইসলাম মতে যার যাকাত দেয়ার সামর্থ্য আছে তাঁর ওপর ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে পশু কুরবানী করার নির্দেশ রয়েছে। ঈদ-উল-আযহার দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী দুইদিন পশু কুরবানীর জন্য নির্ধারিত। আমাদের দেশের মুসলমানরা সাধারণত গরু বা খাসী কুরবানী দিয়ে থাকেন।

পশু কুরবানীর অংশিদার : এক ব্যক্তি একটি গরু বা খাসি কুরবানী করতে পারেন। তবে গরুর ক্ষেত্রে ভাগে কুরবানী করা যায়। সাধারণত গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে ১ থেকে ৭ জন পর্যন্ত শরিক হয়ে কুরবানী করা যায়।

যাদের ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয় :  নেসাব পরিমান মাল যাদের কাছে নেই তাদের ওপর কুরবনী ওয়াজিব নয় তাছাড়া মুসাফির বা ভ্রমনকারির ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।

কখন কুরবানী করা যায় না : ঈদ-উল-আযহার নামাজের আগে কুরবানী করা সঠিক নয়। ঈদ-উল-আযহার নামাযের পর কুরবানী করতে হয়।

কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার পরে তা আদায় না করলে : সকল শর্ত পূর্ণ হয়ে কুরবানী ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও যদি কোন অভাগা কুরবানী না দেয় তবে সে মারাত্মক অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানী করল না, সে যেন আমার ঈদগাহের কাছেও না আসে।

১. হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন: যে ব্যক্তি অর্থ সম্পদ ও অবস্থার দিক দিয়ে সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও কুরবানী করেনা সে যেন আমার নামায পড়ার স্থানের নিকটেও আসে না।

২. রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: সামর্থ্য থাকতে যে কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে। (ইবনে মাজাহ)

প্রিয় ভাইয়েরা আসুন, পবিত্র কুরবানী ও ঈদের নামায যথাযথ ভাবে আদায় করার জন্য মজবুত ইচ্ছা পোষণ করি। কুরবানীর সময় উপস্থিত থাকা : কুরআনীর সময় উপস্থিত থাকা রাসূলের নির্দেশ। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত অপর হাদীসে বলা হয়েছে রাসূল করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা কে লক্ষ্য করে বলেছেন : তুমি ওঠ তোমার কুরবানীর নিকট উপস্থিত হও এবং তা দেখ। কেননা কুরবানীর যে রক্ত প্রবহিত হয় তার প্রতি বিন্দুর বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তোমার অতীত গুনা মাফ করে দেন। হযরত ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনাহা বলেছেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের আপনার পরিবার বর্গের লোকদের জন্য ইহা কি বিশেষ ব্যবস্থা, না আমাদের জন্য ও সব মুসলমানের জন্য ইহা? রাসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন; না বরং আমদেরে ও সর্বসাধারণ মুসলমানদের জন্যই এ ব্যবস্থা। যে লোক সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও কুরবানী করে না, সে যেন আমার নামায পড়ার স্থানে; অর্থাৎ আমার এ মসজিদে না আসে ও নামাজের জামায়াতে শরীক না হয়। সামর্থ্যবান ব্যক্তি কে? যাদের যাকাত ফরয হওয়া পরিমাণ সম্পদ আছে, সেই সামর্থ্যবান ব্যক্তি। এই রূপ ব্যক্তি কুরবানী না দিলে রাসূল করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মসজিদের কাছেও যেতে এবং মসজিদের জামাতে শরীক হতে নিষেধ করেছেন।

কুরবানী পশু যে রকম হবে : ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ, উট এই ছয় প্রকার জন্তু দ্বারা কোরবানী দিতে হবে। প্রথম তিন প্রকার জন্তু দিয়ে কেবল একজনের পক্ষ থেকে এবং শেষের তিন প্রকার জন্তু দিয়ে ৭ জনের পক্ষ থেকে কোরবানী  দেয়া যায়।

কোরবনীর পশুর বয়স : ছাগল পূর্ণ এক বছর হতে হবে। ভেড়া ও দুম্বা যদি এতটুকু মোটাতাজা হয় যে এক বছর বয়সী ভেড়া দুম্বার মত, তবে তা দিয়ে কোরবানী করা জায়েজ আছে। গরু ও মহিষ দুই বছর বয়সী এবং উট পাঁচ বছর বয়সী হতে হবে। এখানে প্রসঙ্গত বিক্রেতা যদি পশু পরিণত বয়স বলে কিন্তু বাস্তবে তা পরিলক্ষিত না হয়, তবে বিক্রেতার কথার উপর নির্ভর করে এ পশু দ্বারা কোরবানী বৈধ হবে।

কুরবানী পশু মোটা তাজা হওয়া বাঞ্ছনীয়। সকল পশু সমান নয়, পশুর মধ্যে খুঁত থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু নিখুঁত পশু দ্বারা কোরবানী দেয়া উত্তম।

যে সকল পশু দ্বারা কুরবানী দেয়া উচিত নহে : যে ছয় ধরনের পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েজ আছে সেই সকল পশুর মধ্যে যদি শরীয়ত নির্ধারিত কোন ধরনের ক্রুটি পাওয়া যায় তবে সে পশুগুলো দ্বারা কোরবানী করা বৈধ নয়। এখন আমরা দেখব কোন ক্রুটিগুলো কুরবানী পশুর মধ্যে বিদ্যমান থাকলে তা দ্বারা কোরবানী করা বৈধ নয়।

* যে পশুর কান কাটা । ইমাম আযম আবু হানীফা (রঃ) এর মতে কানের অর্ধেক বা ততোধিক কাটা হলে সে পশু দ্বারা কুরবানী দেয়া উচিত নয়। * খোঁড়া। * লেজ কাটা। * অত্যন্ত দূর্বল। * দাঁতহীন। * পাগল। তবে নিখুঁত পশু ক্রয় করার পর যদি কুরবানী প্রতিবন্ধক কোন ক্রুটি দেখা দেয় আর ক্রেতা যদি নেসাবের অধিকারী না হন তাহলে তাকে ঐ পশুর বদলে অন্য পশু কোরবানী করতে হবে।

পশু জবেহ করার নিয়ম : কুরবানী পশু কুরবানী দাতার নিজ হাতে জবেহ করা উত্তম। আমাদের নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানী পশু নিজ হাতে জবেহ করেছেন। অন্য লোক দ্বারাও জবেহ করানো যায়। তবে তাকে জবেহ সম্বন্ধীয় সকল নিয়ম কানুন জানা থাকতে হবে। অন্যের দ্বারা জবেহ করানোর সময় নিজে উপস্থিত থাকা উত্তম। জবেহ করার সময় মুখে “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলতেই হবে। জবেহ করার সময় পশুকে কিবলামুখী করে শুইয়ে দেয়া উত্তম। কুরবানী মেয়াদ কাল তিন দিন অর্থ্যাৎ ১০ ই জিলহজ্জ সূর্য উদিত হওয়ার পর থেকে             ১২ই জিলহজ্জ সূর্য অস্ত যাওয়ার আগ পর্যন্ত যখন ইচ্ছা দিনে অথবা রাত্রিকালে কোরবানী করা যেতে পারে। তবে রাত্রিবেলায় জবেহ না করাই ভাল। কারন রাত্রি বেলায় জবেহ করতে গেলে জবেহ ক্রুটি দেখা দিতে পারে। এ কারনে কুরবানী ফযিলত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কুরবানী প্রাণীর দক্ষিণ দিকে রেখে কিব্লামুখী করে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করতে হয়।

কুরবানী গোশত : আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় দেখা যায় একাধিক ব্যক্তির অংশীদারিত্বে কুরবানী দিয়ে, গোশত সমান ভাগে ভাগ করে নিতে হয়। যদি শরীক দ্বারা একমত হয়ে কুরবানী গোশত অনুমান করে ভাগ করে নিতে চান তাও জায়েজ নহে। নিক্তির মাধ্যমে অবশ্যই ওজন করে গোশত ভাগ করে নিতে হবে। কুরবানীতে প্রাপ্ত গোশত তিনভাগ করা উত্তম। তা থেকে এক ভাগ নিজ পরিবার বর্গের জন্য, একভাগ আত্মীয় স্ব-জন, বন্ধু বান্ধব ও পরিচিতজনদের জন্য, একভাগ গরীব, অসহায়, অনাথ মিসকিনদের জন্য। তবে পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদি অনেক বেশি হয় এবং প্রাপ্ত গোশত বন্টন করলে নিজেদের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য হয় তবে ভাগ না করে সবটাই নিজেরা ভোগ করা যায়। তবে একটা কথা সকল সময় আমাদের মনে রাখা উচিত, ইসলাম সাম্যের ধর্ম। এখানে আপনার উপর আপনার প্রতিবেশী এবং গরীব মিসকিনদের উপর মারাত্মক দাবি রয়েছে। যা কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

গোশত বানানোর মজুরী : যাদের দ্বারা কুরবানীর পশু কাটানো হয় তাদেরকে পারিশ্রমিক হিসেবে কুরবানী গোশত দেয়া বৈধ নয়। এটা ইসলামী শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং কঠিন গুনাহের কাজ। এ সকল মজুরদেরকে টাকা পয়সা বা অন্য কিছু দিতে হবে।

কুরবানীর পশুর চামড়া : কুরবানীর পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ দান করে দেয়ার নির্দেশ রয়েছে। পশুর চামড়া নিজের ব্যবহারে লাগানো যায়। কুরবানী চামড়া দিয়ে জায়নামায, কিতাবের মলাট, দস্তরখানা ইত্যাদি তৈরি করে নিজে ব্যবহার করা যায়। নিজে যদি ব্যবহার না করে তবে গরীব মিসকিনকে চামড়া দিতে হয়। চামড়া গরীব মিসকিনদের হক। তবে সবসময় খেয়াল রাখতে হবে কুরবানী পশুর চামড়া, গোশত বা পশুর অন্য কোন অংশ পরিশ্রমের বিনিময়ে দেয়া যাবে না। না জানার কারনে অথবা জেনেও যদি এ সকল শর্ত ভঙ্গ করা হয় তবে পূনরায় তার মূল্য গরীবদের মাঝে বিলি করি দিতে হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উম্মতে মোহাম্মদীকে সম্মানিত করে তাদের এ দুটো ঈদ দান করেছেন। আর এ দুটো দিন বিশ্বে যত উৎসবের দিন ও শ্রেষ্ঠ দিন রয়েছে, তার সবক’টির চেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন ও সেরা ঈদ। ইসলামের এ দুটো উৎসবের দিন শুধু আনন্দ-ফূর্তির দিন নয়, বরং এ দিন দুটোকে আনন্দ-উৎসব এর সাথে সাথে এই আসমান-জমিনের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহতায়ালার ইবাদত-বন্দেগি দ্বারা সুসজ্জিত করতে পারলেই ঈদের তাৎপর্য আরো বেশি উদ্ভাসিত হবে।

You may also like