Home ইসলাম কসরের নামায নিয়মাবলী

কসরের নামায নিয়মাবলী

by admin
০ comment

কসর আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো কম করা, কমানো, সংক্ষিপ্তকরণ। মুসাফির অবস্থায় যোহর, আসর এবং এশার নামায ফরয চার রাকা’আতের স্থলে দুই রাকা’আত পড়া। একাকী নামায পড়লে কিংবা স্বয়ং কোন নামাযের ঈমামতি করলেও দুই রাকা’আত পড়তে হবে। কসর অর্থ হচ্ছে চার রাকা’আত বিশিষ্ট যোহর আসর ও এশার নামায দুই রাকা’আত পড়া।

কসরের ব্যাপারে কুরআন মজীদে দুটি সূরায় আলোচনা হয়েছে। একটি হলো সূরা আল বাকারা : ২৩৮ ও ২৩৯ আয়াত এবং আরেকটি হলো সূরা আন নিসা : ১০১ ও ১০২ আয়াত । এখানে উভয় সূরার আয়াতগুলো উল্লেখ করা হলো :
১. সমস্ত নামাযকে হিফাযত করো, বিশেষ করে মধ্যম নামাযকে। আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনয় সহকারে দাঁড়াও। তবে অশান্তি ও গোলযোগের আশংকা থাকলে পায়ে হেঁটে অথবা বাহনে চড়ে যেভাবেই সম্ভব নামায পড়ো। আর নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেলো আল্লাহকে সেই পদ্ধতিতে স্মরণ করো (নামায পড়ো), যা তিনি তোমাদের শিক্ষা দিয়েছেন-ইতিপূর্বে যা তোমাদের অজ্ঞাত ছিলো। (বাকারা : ২৩৮-২৩৯)

২.আর যখন তোমরা সফরে বের হও, তখন নামায সংক্ষেপ করো নিলে কোনো ক্ষতি নেই। (বিশেষ করে) যখন তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফিররা তোমাদের কষ্ট দেবে। কারণ তারা প্রকাশ্যে তোমাদের শত্রুুতা করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। আর হে রাসূল। যখন তুমি মুলমানদের মধ্যে থাকো এবং (যুদ্ধাবস্থা) তাদেরকে নামায পড়াবার জন্যে দাঁড়াও, তখন তাদের মধ্যে একটি দলের তোমার সাথে দাঁড়িয়ে যাওয়া উচিত এবং তারা অস্ত্রশস্ত্র সংগে নেবে। তারপর তারা সেজদা করে নিলে পেছনে চলে যাবে এবং দ্বিতীয় দলটি, যারা এখনো নামায পড়েনি, তারা এসে তোমার সাথে নামায পড়বে। আর তারাও সতর্ক থাকবে এবং নিজেদের অস্ত্র শস্ত্র বহন করবে। কারণ কাফিররা সুযোগের অপেক্ষায় আছে। তোমরা নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র ও জিনিস পত্রের দিক থেকে সামান্য গাফিল হলেই তারা তোমাদের উপরে অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়বে। তবে যদি তোমরা বৃষ্টির কালে কষ্ট অনুভব করো, অথবা অসুস্থ থাকো, তাহলে অস্ত্র রেখে দিলে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু তবুও সতর্ক থাকো। (নিসা : ১০১-১০২)

কসর নামাযের নিয়মাবলী এবং শর্তসমূহ

১) ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে ৪৮ মাইল বা তার বেশি পথ অতিক্রম করলে ।
২) যে স্থানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সফর করা হবে, সে স্থানে যদি ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত হয়, তাহলে ব্যক্তি গন্তব্যস্থলে পৌঁছে তার নামায কসর করবেন।
৩) আর যদি গন্তব্যস্থলে তার ১৫ দিনের বেশী থাকার নিয়ত হয়, তাহলে সে স্বাভাবিক চার রাকায়াত নামাযই পড়বেন।
৪)কসর নামাযের নিয়ম হলো কেবল চার রাকা’আত বিশিষ্ট ফরয নামায যেমন যোহর, আসর ও এশার নামায ৪ রাকা’আতের পরিবর্তে ২ রাকা’আত পড়া।
৫)মাগরিবের ৩ রাকা’আত ফরয এবং এশার ২ রাকা’আত এর সাথে বিতরটা পড়তে হবে।
৫.কসরের নামাযের ফযিলত
মূলত এই কসর নামাযের বিধানের মধ্যে মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বড় শিক্ষা রয়েছে আর তা হলো কোনো অবস্থায়ই ফরয ইবাদত অলসতার কারণে বা সমস্যা থাকার কারণে পুরোপুরি ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই ।
১.রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘তোমরা সফরে নামাজকে কসর করো, এর মধ্যেই রয়েছে উত্তম প্রতিদান।’( বায়হাকি)
২. হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে কিছুটা দীর্ঘ একটি উদ্ধৃত করেছেন, যার শেষের পবিত্র শব্দাবলী এরূপ-আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে কসর নামায প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটি একটি ‘সাদক্বাহ’ যা আল্লাহতায়ালা দান করেছেন। তোমরা এ ‘সাদক্বাহ’ গ্রহণ করো। (সহীহ মুসলিম)
৩.যে ব্যক্তি সফরে চার রাকা’আত (ফরয) পড়ে, সে আল্লাহতায়ালার ‘সাদক্বাহ’থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আল্লাহ তায়ালার ‘সাদক্বাহ’ কবূল করা এবং সফরে কসর করা ফরয। (তাবরানী ‘মুজামে সাগীর)
৪. হযরত য়ালা ইবনে উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে আরজ করলাম, আল্লাহপাকতো বলেছেন, যদি তোমরা কাফেরদের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য কোন রকম ফেতনার আশংকা কর তাহলে নামায কসর করাতে কোন দোশ নাই। এখনতো নিরাপত্তার যুগ (সুতরাং কসর না করা দরকার)। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি যে কথায় আশ্চার্যান্বিত হয়েছো আমিও সে ব্যাপারে আশ্চর্য বোধ করেছিলাম এবং রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম উত্তরে তিনি বললেন, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য একটি ছদকা। তোমরা আল্লাহর ছদকা গ্রহণ কর। (সহীহ মুসলিম)

কসরের নামায কখন পড়বেন

সফরে থাকা অবস্থায় তাড়া থাকলে বা অসুবিধা থাকলে (যোহর+আসর) এবং (মাগরিব + এশা) এই দুই ওয়াক্তের নামায যে কোনো এক ওয়াক্তে এক সাথে পড়া যায়। অর্থাৎ যোহরের ওয়াক্ত হলে যোহর পড়ে আসর নামাযকে এগিয়ে নিয়ে এসে যোহর ও আসর এক সাথে পড়া যায় অথবা, আসরের ওয়াক্তে যোহরকে পিছিয়ে দিয়ে যোহর ও আসর একসাথে পড়া যায়। অনুরূপ করা যায়, মাগরিব ও এশা এই দুই ওয়াক্তের নামায যে কোনো এক ওয়াক্তে একসাথে পড়া যায়। একে নামায “জমা করা” বলে। উল্লেখ্য, নামায এক সাথে পড়ার যে নিয়ম বর্ণনা করা হলো এর বাইরে করা যাবেনা, যেমন ফজর আর যোহর এক সাথে করা যাবেনা।
দলীল জানতে চাইলে, সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম সালাত অধ্যায়ের নামায কসর ও সংক্ষিপ্ত করার অনুচ্ছেদ দেখুন, সবগুলো হাদীসে এর ব্যাখ্যা পেয়ে যাবেন।
কসরের নামায ঈমামের পিছনে পড়লে
কেহ যদি কোন মুকিমের পিছনে জামায়াতে নামায আদায় করে তাহলে তাকে পুরা নামায আদায় করতে হবে। আর সে যদি স্বয়ং ঈমাম হয় তাহলে মোক্তাদিগকে জানায়ে দিতে হবে যে সে মুসাফির কারণ এই অবস্থায় ঈমাম কসর পড়বে এবং মোক্তাদিগণ পুরা নামায আদায় করবে।
হযরত নাফে (রঃ) থেকে বর্ণিত, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কা শরীফে দশ রাত অবস্থান করেছিলেন তখন নামায কসর করতেন। কিন্তু যখন ঈমামের পিছনে পড়তেন তখন পূর্ণ পড়তেন। (মুয়াত্তা মালেক)।

নিজেরা কসরের নামায জামায়াতে পড়লে

নিজেরা কসরের নামায জামায়াতে পড়লে দুই রাকা’আত নামায পড়তে হবে।

একাকী কসরের নামায পড়লে

একাকী কসরের নামায পড়লে দুই রাকা’আত পড়তে হবে।

কসরের নামাযের কাযা

কসরের নামায যদি কোন কারনে কাযা হয়ে যায় তাহলে কাযাও সেই নামায কসর পড়তে হবে।

নিরাপত্তা থাকা সত্বেও কসর পড়া

১.আহমাদ ইবনে ইউনুস (র) ও আওন ইবনে সালাম (র) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর অথবা ভয়-ভীতি ছাড়াই মদীনায় যোহর ও আসরের সালাত একত্রে আদায় করেছেন। আবু যুবায়র (র) বলেন, আমি সাঈদকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন এইরূপ করলেন? তিনি বললেন, তুমি যেমন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছ, আমিও তেমনি ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তখন তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্দেশ্য ছিল, তার উম্মাতের কেউ যেন কষ্টে না পড়ে। (সহীহ মুসলিম)
২.হযরত ওমরের বর্ণনা খুবই চমৎকার। তিনি বলেন নিরাপদ সফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামায কসর করতে দেখে আমি বিস্ময়বোধ করি এবং তাঁকে কসরে আয়াতটি উল্লেখ করে জিজ্ঞাসা করি : আল্লাহ তায়ালা তো বলেছেন তোমরা যদি আশংকা করো, কাফিররা তোমাদেরকে বিপদে ফেলবে, তবে তোমরা নামায কসর করেতে পারো।” আমরা তো এখন নিরাপদ সফর করছি, তবু আপনি নামায কসর করলেন, এর কারণ কি? জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি একটি দান (অবকাশ, অনুগ্রহ), সুতরাং তোমরা তাঁর দেয়া এই দান (অবকাশ ও অনুগ্রহ) গ্রহণ করো।
৩. হরেছা বিন ওহাব খুযায়ী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে মিনায় (চার রাকা’আতের স্থলে দুই রাকা’আত নামায পড়েছেন, অথচ এ সময় আমরা ছিলাম সকল ভয়ভীতি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। (সহীহ আল বুখারি, সহীহ মুসিলম)
৪.ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া (র) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন ভয়-ভীতি ও সফর ছাড়াই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর ও আসরের সালাত এবং মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে আদায় করেন। (সহীহ মুসলিম)
৫.হযরত য়ালা ইবনে উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি হযরত ওমর ইবনুুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে আরজ করলাম, আল্লাহপাকতো বলেছেন, যদি তোমরা কাফেরদের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য কোন রকম ফেতনার আশংকা কর তাহলে নামায কসর করাতে কোন দোশ নাই। এখনতো নিরাপত্তার যুগ (সুতরাং কসর না করা দরকার)। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি যে কথায় আশ্চার্যান্বিত হয়েছো আমিও সে ব্যাপারে আশ্চর্য বোধ করেছিলাম এবং রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম উত্তরে তিনি বললেন, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য একটি ছদকা। তোমরা আল্লাহর ছদকা গ্রহণ কর। (সহীহ মুসলিম)

You may also like